অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জেলাগুলো হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। এসব জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আট লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন মানুষ, যাদের অধিকাংশের বাড়িঘর ডুবে গেছে।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম
ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ সহায়তায় জেলা প্রশাসনগুলোর পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক মাঠে কাজ করছেন বলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ৪৩ জনের মধ্যে বন্যা ও পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার জেলায়। ওই জেলায় এ পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১৩ জন রয়েছেন। চট্টগ্রাম জেলায় মারা গেছেন ১১ জন। বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ছয় জন এবং রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় তিন জনের মৃত্যু হয়েছে।
আহত ও ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা
দুর্যোগে পাঁচ জেলায় মোট আহত হয়েছেন ৩৯ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ১২ জন, কক্সবাজারে ২৪ জন, খাগড়াছড়িতে একজন এবং বান্দরবানে দুজন। কক্সবাজারে আহতদের মধ্যে পাঁচ জন রোহিঙ্গা। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আট লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছয় লাখ ৬২ হাজার। কক্সবাজারে এক লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন, রাঙামাটিতে তিন হাজার ৮২০ জন, খাগড়াছড়িতে ৩৪ হাজার ৪১৭ জন এবং বান্দরবানে আট হাজার ৩৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণ বিতরণ
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৬৭০টি, কক্সবাজারে ৬৪০টি, রাঙামাটিতে ৪৭টি, খাগড়াছড়িতে ১৫০টি এবং বান্দরবানে ২২০টি। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন। চট্টগ্রামের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ২২ হাজার ৬০০ জন, কক্সবাজারে দুই হাজার ৯৭৪ জন, রাঙামাটিতে তিন হাজার ৮২০ জন, খাগড়াছড়িতে দুই হাজার ৯১৬ জন এবং বান্দরবানে চার হাজার ৭৪৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
সার্বিক পরিস্থিতি ও বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্য
সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভাগের যে চার জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। পানিবন্দি লোকজনকে উদ্ধারের পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। অনেক এলাকা ডুবে থাকায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।’
স্থানীয় পরিস্থিতি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়। দুই উপজেলার কয়েক লাখ বাসিন্দা এখনও পানিবন্দি। এ ছাড়াও হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া উপজেলায়ও বন্যায় বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সাত উপজেলায় জেলা প্রশাসনের হিসেবে পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট লাখের বেশি। তারা খাদ্য সংকটে পড়েছেন। এসব উপজেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকটেও পড়েছেন তারা।
সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় গত কয়েক দিন ধরে বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকায় অন্ধকারে দিন কাটছে অধিকাংশ পরিবারের। ঘরে নেই খাবার, রান্নার সুযোগ নেই, তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির। মোবাইল ফোনে চার্জ না থাকায় অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না আত্মীয়-স্বজনরা। এ দুই উপজেলায় ভেঙে পড়েছে অসংখ্য বসতঘর।
বাঁশখালীতে ভয়াবহ পরিস্থিতি
বাঁশখালী উপজেলায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে পশ্চিম বাঁশখালীর কাথারিয়া, বড়ইতলী, গণ্ডামারা, ডোমরা, কদমরসূল, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, চাম্বল, ছনুয়া, শেখেরখীল, সরল, রায়ছাটা, পুঁইছড়িসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায়। এসব এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক একতলা বাড়িও পুরোপুরি পানিতে ডুবে রয়েছে। অসংখ্য কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে, পাকা ও আধাপাকা বাড়ির নিচতলায় জমেছে কোমরসমান পানি। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকে বাড়ির উঁচু অংশ কিংবা টিনের ছাদে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।



