হুইলচেয়ারে বসে ফুটবল বিশ্বকাপ কভার করছেন ভেনেজুয়েলার সাংবাদিক মানু গুতিয়েরেজ
হুইলচেয়ারে বসে বিশ্বকাপ কভার করছেন মানু গুতিয়েরেজ

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় আর্জেন্টিনার অনুশীলন মাঠে প্রথমবার হঠাৎ চোখ আটকে গিয়েছিল অনেকের। হুইলচেয়ারে বসা এক তরুণ একাগ্র চিত্তে দেখছিলেন লিওনেল মেসিদের অনুশীলন। সেদিন কথা বলার সুযোগ না হলেও, পরে কানসাসের মিডিয়া সেন্টারে আবার দেখা মিললো তার। তিনি আর কেউ নন, এই মুহূর্তে ফুটবল বিশ্বে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভেনেজুয়েলার ৩০ বছর বয়সী অদম্য ক্রীড়া সাংবাদিক মানু গুতিয়েরেজ। শারীরিক সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে এই মুহূর্তে তিনি মাঠ থেকে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

মাঠ থেকে মাঠে মানুর সরব উপস্থিতি

অনুশীলন গ্রাউন্ড থেকে শুরু করে ম্যাচের ভেন্যু— সব জায়গাতেই মানুর সরব উপস্থিতি। সম্প্রতি আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনালের সংবাদ সম্মেলন এবং ম্যাচ কাভার করতে এসেছিলেন তিনি। মিক্সড জোনে খোদ লিওনেল মেসি তার চাকার সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। মেসির সেই সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর থেকেই বিশ্ব মিডিয়ার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন মানু গুতিয়েরেজ।

ছায়া হয়ে আছেন বাবা, প্যাশন থেকেই সাংবাদিকতা

হুইলচেয়ারে বসা মানুর প্রতিটি যাত্রায় ছায়া হয়ে আছেন তার বাবা। ছেলের ফুটবল এবং সাংবাদিকতার প্রতি এমন তীব্র অনুরাগ দেখে বাবাও নিজেকে সঁপে দিয়েছেন ছেলের স্বপ্ন পূরণে। কানসাসের মিডিয়া সেন্টারে বাবার সামনেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে মানু বলেন, “আমি মূলত ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা করি, নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করি। এতেই আমার ভীষণ আনন্দ। ফুটবল আমার প্রাণ, আর বিশ্বকাপ তো সম্পূর্ণ অন্যরকম এক উন্মাদনা! তাই নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি, যুক্তরাষ্ট্র চলে এসেছি।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমি খেলা দেখতে এবং খেলা নিয়ে লিখতে ভালোবাসি। এটা আমার প্যাশন। মানুষের যদি সত্যিকারের ভালোবাসা আর চেষ্টা থাকে, তবে সে যেকোনও বাধা টপকে যেতে পারে। আমার তীব্র ইচ্ছে আর মানসিক শক্তির জোরেই আজ আমি এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি।”

‘মেসি শুধু বড় খেলোয়াড় নন, বিশাল মনের মানুষ’

বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের মতো মানু গুতিয়েরেজ নিজেও লিওনেল মেসির অন্ধ ভক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সেই প্রিয় তারকার মুখোমুখি হওয়া, কথা বলা এবং সরাসরি সাক্ষাৎকার নিতে পারাটা তার কাছে স্বপ্নের মতো।

মেসির সঙ্গে সেই স্মরণীয় মুহূর্তের গল্প শুনিয়ে মানু বলেন, “মেসিকে একদম সামনে থেকে দেখে এবং কথা বলে মনে হয়েছে তিনি সত্যিই এক কিংবদন্তি। তবে খুব কাছ থেকে দেখার পর মনে হয়েছে তিনি কেবল মাঠেরই বড় খেলোয়াড় নন, মানুষ হিসেবেও অনন্য এবং তার মনটা বিশাল। মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার অত্যন্ত কষ্টার্জিত এবং বিতর্কিত ম্যাচের পর আমি তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাই। তার কান্না, গোল এবং ওই ম্যাচের নানা বিতর্কিত দিক নিয়ে আমি প্রশ্ন করেছিলাম। মেসি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, যা আমাকে ভীষণ আপ্লুত করেছে।”

বেলিংহামের সংহতি ও বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা

বিশ্বকাপ চলাকালেই মানুর দেশ ভেনেজুয়েলায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যাতে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নিজ দেশের এই দুর্যোগের সময়ে মিক্সড জোনে ইংল্যান্ডের তারকা ফুটবলার জুড বেলিংহামকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছিলেন মানু। সেই স্মৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বেলিংহাম আমার প্রশ্নের উত্তরে ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সংহতি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ফুটবল নিয়েও কথা বলেছেন।”

শুধু বেলিংহামই নন, দূরঘুরে থাকা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও যে ভেনেজুয়েলার এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে নানানভাবে সমবেদনা প্রকাশ করেছে, তা জানা আছে মানুর। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে যে অভূতপূর্ব উন্মাদনা হয়, সেটিও আন্তর্জাতিক সংবাদে দেখেছেন তিনি।

বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীদের ধন্যবাদ জানিয়ে মানু গুতিয়েরেজ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে, তা আমি নানা মাধ্যমে দেখেছি। এটা আমার দারুণ লেগেছে। আর আমার দেশের (ভেনেজুয়েলা) এই কঠিন সময়ে সহমর্মিতা ও সংহতি প্রকাশের জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে আমি মন থেকে ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”

হুইলচেয়ারে ভর করে এক ভেন্যু থেকে অন্য ভেন্যুতে ছুটে চলা মানু গুতিয়েরেজ তীব্র ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের জন্য এক জীবন্ত ও বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন।