২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু থেকেই কৌশলগত কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ছে, যা ফুটবলকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ক্লাব ফুটবলের দীর্ঘ মৌসুমে গড়ে ওঠা কৌশলগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন সব কৌশল দেখা যাচ্ছে। পুরনো ধারণাগুলো নতুন করে জেগে উঠেছে, এবং ফুটবল দাঁড়িয়েছে নতুন এক বাস্তবতায়।
আবারও আলোচনায় ৪-৪-২
একসময় ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত ফরমেশন ৪-৪-২। আধুনিক ফুটবলে ৪-৩-৩ বা ৩-৫-২-এর মতো জটিল কাঠামো জনপ্রিয় হলেও এবারের বিশ্বকাপে অনেক দল আবার ৪-৪-২-এ ফিরেছে। ইকুয়েডর, মরক্কো, ব্রাজিল, আইভরি কোস্ট, জাপান ও স্কটল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দল বল ছাড়া অবস্থায় এই ফরমেশন ব্যবহার করছে। তবে এটি আগের মতো সারাক্ষণ হাই প্রেসিং নয়; বরং মাঝমাঠে একটি সুশৃঙ্খল ‘মিড-ব্লক’ তৈরি করে প্রতিপক্ষকে ধীরগতিতে খেলতে বাধ্য করার কৌশল। এই রক্ষণাত্মক বিন্যাসে মাঠের প্রস্থ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও মাঝমাঠ ও রক্ষণের মাঝখানে কিছু ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, যা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষরা।
তির্যক আক্রমণ বাড়াচ্ছে কার্যকারিতা
৪-৪-২-এর দুটি সমান্তরাল লাইনের বিপক্ষে সরাসরি আক্রমণের চেয়ে তির্যক বা ডায়াগোনাল মুভমেন্ট অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচে সেটির স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায়। মরক্কোর ডিফেন্ডার নুসাইর মাজরাউই বারবার উইং থেকে ভেতরের দিকে ডায়াগোনাল পাস দিয়ে ব্রাজিলের রক্ষণ ভেঙেছেন। ব্রাজিলের দুই মিডফিল্ডার বলের দিকে বেশি সরে আসায় বিপরীত পাশে বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, যেখান থেকে গড়ে ওঠে আক্রমণ। অন্যদিকে কেপ ভার্দেও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঝমাঠ থেকে উইংয়ের দিকে ডায়াগোনাল দৌড়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে আরও বিস্তৃত করে দিচ্ছিল। এতে ক্রস ও কাট-ব্যাকের জন্য বাড়তি জায়গা তৈরি হয়। আধুনিক ফুটবলে এই ধরনের তির্যক দৌড় ও পাস এখন আক্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠছে।
‘ফলস নাইন’ এর পুনরুত্থান
শুধু নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা স্ট্রাইকারের যুগ অনেকটাই অতীত হয়ে গেছে। এখন ফরোয়ার্ডরা মাঝেমধ্যে অনেক নিচে নেমে এসে কিংবা উইংয়ে সরে গিয়ে খেলছেন, যাকে বলা হয় ‘ফলস নাইন’। এই ভূমিকায় থাকা খেলোয়াড়কে অনুসরণ করলে সেন্টার-ব্যাকদের পেছনে জায়গা ফাঁকা হয়ে যায়; তাকে ছেড়ে দিলে তিনি সহজেই বল ধরে আক্রমণ সাজাতে পারেন। মরক্কোর ইসমাইল সাইবারি, জার্মানির কাই হাভার্টজ এবং মেক্সিকোর রাউল হিমেনেজ এই কৌশল কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন। তবে এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের হ্যারি কেইন। মেক্সিকোর বিপক্ষে তিনি ক্ষেত্রবিশেষে দুই সেন্টার ব্যাকের মাঝেও চলে আসেন বিল্ডআপে সাহায্য করতে। প্রতিপক্ষের জন্য তাই হ্যারি কেইনের চলাফেরার মারপ্যাঁচ নজরে রাখা এক কঠিন গোলকধাঁধার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
গতিশীল মিডফিল্ডের উত্থান
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আক্রমণভাগগুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তাদের খেলায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট অবস্থানে আটকে না থেকে চারজন মিডফিল্ডার ক্রমাগত অবস্থান বদল করছেন। ফলে প্রতিপক্ষের জন্য ম্যান মার্কিং দুরূহ হয়ে পড়ে। স্পেনের আক্রমণের ধরন আবার একটু ভিন্ন; তারা মাঝমাঠে ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষকে টেনে এনে হঠাৎই ফাঁকা জায়গায় লম্বা পাস খেলছে। দক্ষিণ কোরিয়াও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে, যেখানে মাঝমাঠে সংখ্যাধিক্য তৈরি করে প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে এনে পরে দ্রুত আক্রমণে যাওয়া হয়েছে। এই ‘পজিশনাল ফ্লুইডিটি’ বা মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের ডিবক্সে আচমকা প্রবেশের প্রবণতা কৌশলের দিক থেকে এই বিশ্বকাপকে অনন্য এক বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
ডেভিড-দের উত্থান
এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ হওয়ায় অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন বিশ্বর্যাঙ্কিংয়ের নিচের সারির দলগুলোর জন্য মাঠে টিকে থাকাই দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে। সেই শঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় কেপ ভার্দে। উরুগুয়ে এবং স্পেনের মতো বিশ্বকাপজয়ী দলের সাথে একই গ্রুপে পড়লেও তারা বিন্দুমাত্র খেই না হারিয়ে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দেয় তাদের রক্ষণভাগের চমৎকার বোঝাপড়ার মাধ্যমে। ৫-৪-১ ফর্মেশনে তারা মাঝমাঠে গড়ে তোলে দুর্ভেদ্য দেয়াল। আর যে দুই-একটা শট ডিফেন্স চিড়ে গোলকিপার পর্যন্ত পৌঁছায়, সেগুলোও একটার পর একটা অবিশ্বাস্য সেইভ দিয়ে ঠেকিয়ে দেন ভোজিনিয়া। ভাঙবে, কিন্তু মচকাবে না—এটাই যেন ডেভিড বনাম গোলিয়াথের যুদ্ধে ডেভিড-দের মোক্ষম অস্ত্র।
শৃঙ্খলিত বিশৃঙ্খলা
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি কেপ ভার্দের সাথে ম্যাচের আগে বলেন: ‘খেলার আবেগ যখন তুঙ্গে থাকে, ট্যাকটিক্স তখন জানালা দিয়ে পালায়।’ শতশত ভিডিও অ্যানালিসিসের পরেও দিনশেষে খেলাটা হয় মাঠে, যেখানে অনেক সময় কোনো হিসাবই মেলে না। যেমনটি মেলেনি প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ফ্রান্সের; যেখানে তাদের দুর্বল প্রতিপক্ষের কাছে হেসেখেলে জেতার কথা, সেই ম্যাচে এই বিশ্বকাপে তাদের অন্যতম কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। তবে ফুটবল সর্বদাই একক নৈপুণ্য আর প্রতিভার পক্ষ নেয়। সে কারণে আর্জেন্টিনা আশায় বুক বাঁধে, হয়তো লিওনেল মেসি পরের ফ্রিকিকেই জালে বল জড়াবেন। ফ্রান্সও যেমন কিলিয়ান এমবাপ্পে আর মাইকেল ওলিসে—এই দুইজনের পায়ে বল গেলেই প্রস্তুতি নেয় গোল উদযাপনের। স্পেন ঘোর বিপদেও তাকিয়ে থাকে লামিন ইয়ামালের দিকে। মাঠের বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে তাই সব দলই চেয়ে থাকে তাদের তারকা খেলোয়াড়দের দিকে। অতীতে বিশ্বমঞ্চে এমন সব শৃঙ্খলিত বিশৃঙ্খলার কারিগরকে একসঙ্গে জ্বলে উঠতে দেখা যায়নি; এবারের বিশ্বকাপ এদিক থেকেও বেশ আলাদা।
বিশ্বকাপে কৌশলের নতুন বাস্তবতা
বিশ্বকাপের শুরুতেই স্পষ্ট হয়েছে, আধুনিক ফুটবলে শুধুমাত্র বল দখল কিংবা আক্রমণাত্মক ফুটবলই সাফল্যের একমাত্র পথ নয়। কখন প্রতিপক্ষকে ‘গেগেনপ্রেসিং’-এ চেপে ধরতে হবে, কখন মাঝমাঠে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে, কীভাবে প্রতিপক্ষের কাঠামো ভাঙতে হবে—এসব কৌশলই এখন ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। পুরোনো ৪-৪-২-এর প্রত্যাবর্তন, ফলস নাইন, তির্যক আক্রমণ, গতিশীল মিডফিল্ড এবং পরিকল্পিত সেট-পিস—এইসকল প্রবণতাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এবারের বিশ্বকাপ কেবল তারকাদের নয়, কোচদের কৌশলগত লড়াইয়েরও মঞ্চ হয়ে উঠেছে ভালোভাবেই।



