ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক বিকিরণজনিত ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছে, তারা এই যুদ্ধের ফলে সম্ভাব্য একটি ‘পারমাণবিক দুর্ঘটনা’ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার পরিণতি হবে বর্ণনাতীত ও বিপর্যয়কর। ডব্লিউএইচও-এর ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান অঞ্চলের পরিচালক হানান বালখি এই সপ্তাহে ‘পলিটিকো’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হবে একটি পারমাণবিক দুর্ঘটনা বা হামলা, যা তাদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে।
পারমাণবিক হামলার ভয়াবহতা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
হানান বালখি স্পষ্ট করে বলেন, তারা যতই প্রস্তুতি গ্রহণ করেন না কেন, এর ফলে সৃষ্ট ক্ষতি ঠেকানোর কোনো উপায় নেই এবং এই প্রভাব কয়েক দশক ধরে বজায় থাকবে। তিনি ১৯৪৫ সালে জাপানে পরমাণু বোমা হামলা এবং ১৯৮৬ সালে ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনার পরিণতি সম্পর্কে যারা সচেতন, তারা বর্তমান বিপদের ভয়াবহতা সহজেই বুঝতে পারবেন। তার মতে, এর ফলে কেবল তাৎক্ষণিক মৃত্যু নয়, বরং পরিবেশ ও শ্বাসতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ প্রভাব পড়বে, যার ফলে ক্যানসারের মতো রোগ কয়েক প্রজন্ম ধরে চলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক সক্ষমতা ও যুদ্ধের প্রেক্ষাপট
ডব্লিউএইচও-এর এই সতর্কতা এমন এক সময়ে এলো যখন গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্র—নাতানজ, ইসফাহান এবং ফোরডোতে নজিরবিহীন বোমা হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে সেই স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে, যদিও ইরান সরকার এখন পর্যন্ত এই হামলার ফলে সৃষ্ট মানবিক ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। এই অঞ্চলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল একমাত্র ঘোষিত পারমাণবিক শক্তি এবং আরব আমিরাতেও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। যদিও জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে যে ইরান এখনও বোমা তৈরির পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেনি, তবুও যুদ্ধের তীব্রতা তাদের সেই পথে ঠেলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের আশ্বাস ও ডব্লিউএইচও-র পরামর্শ
গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন যে ইসরায়েল এই অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তবে তার এই আশ্বাসের বিপরীতে ডব্লিউএইচও স্থানীয় জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য বিকিরণ মোকাবিলায় সর্বোত্তম কৌশল অবলম্বন করার পরামর্শ দিচ্ছে। উল্লেখ্য, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে করোনা অতিমারি মোকাবিলায় ব্যর্থতা এবং ভাইরাসের বিপদের মাত্রা গোপন করার অভিযোগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল। এবার যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে তাদের আগাম সতর্কতা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
পরিবেশগত বিপর্যয়ের শঙ্কা ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান
পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার ফলে বায়ুমণ্ডলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা কেবল ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও তার বাইরেও দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিপর্যয় রুখতে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা জোর দিয়ে বলছেন যে, যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে এবং পারমাণবিক ঝুঁকি এড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।



