সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, দেশের সাড়ে ১৪ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়লে শুধু মূল্যস্ফীতিই নয়, বৈষম্য, দারিদ্র্য, তারল্য সংকটসহ আর্থসামাজিক নানা ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন, সরকার সেদিকে দৃষ্টি না দিলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট আরও বেড়ে যেতে পারে।’
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয় ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর মূল বেতন পাঁচ শতাংশ হারে বাড়লেও নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
নতুন বেতন কমিশনের সুপারিশ
২০২৫ সালে নতুন একটি বেতন কমিশন গঠন করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ওই কমিশন বেতন কাঠামো পর্যালোচনা শেষে গত জানুয়ারিতে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ ছাড়া বৈশাখী ভাতার হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ এবং যাতায়াত ভাতা বৃদ্ধিরও সুপারিশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। কমিশন সুপারিশ করলেও সেটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দেয় অধ্যাপক ইউনূসের সরকার।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগ
গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর আগের কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে বিএনপি সরকার। কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে। সেখানে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের, অর্থাৎ মধ্যম ও নিম্ন পদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য খুব শিগগিরই খসড়া রূপরেখা মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। অনুমোদন শেষে চলতি মাসেই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে পারে বলেও জানা গেছে।
মুদ্রাস্ফীতি উসকে দেবে
প্রতি পাঁচ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা পর্যালোচনার বিধান থাকলেও গত ১০ বছরে তা একবারও করা হয়নি। ফলে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগকে যৌক্তিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘বিশেষ করে গত এক দশকে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সেই বিবেচনায় নতুন পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগ অত্যন্ত যৌক্তিক।’
তবে উদ্যোগটি এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘ফলে সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক হলেও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সেটি কী ধরনের প্রভাব ফেলবে বা নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে চলে আসছে।’
গত কয়েক বছর ধরেই দেশে মূল্যস্ফীতির হার উচ্চ। গত জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার আগের মাসের তুলনায় কিছুটা কমলেও এখনও তা ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘এর মধ্যে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।’
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, নতুন পে-স্কেলে বাড়তি বেতন দিতে সরকারকে হয় ঋণ নিতে হবে, নয়তো নতুন টাকা ছাপাতে হবে। এতে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। তার ভাষায়, ‘তখন সেটা সামাল দেওয়া সরকারের জন্য আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াবে।’
বাড়তে পারে জিনিসপত্রের দাম
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। ফলে বাজারে পণ্যের চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে। ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘ফলে স্বাভাবিকভাবেই জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যেতে পারে।’ তবে চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় থাকলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘কিন্তু আমাদের দেশের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চাহিদা বাড়লেই ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম কয়েকগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।’ তার মতে, নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
তিনি বলেন, ‘সরকার যদি নিত্যপণের সংকট বা লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।’
বৈষম্য ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির শঙ্কা
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বর্তমানে দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখের কিছু বেশি। নতুন পে-স্কেলের আওতায় মূলত তাদেরই বেতন-ভাতা বাড়বে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৯৭ লাখ।
ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘অর্থাৎ মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে কাজ করছে, অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে তাদের বেতন-ভাতা বাড়ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে দেশে আয় বৈষম্য ও দারিদ্র্য—দুটিই বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে।
ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন-ভাতা না বাড়লে আয় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। এর ফলে দেশে দারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পেতে পারে।’
তারল্য সংকট
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। বাজেটের ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে রাখা হয়েছে।
ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘কিন্তু বাড়তি এই ব্যয়ের বিপরীতে সরকারের আয় সেভাবে বাড়ছে না। বরং নতুন বাজেটের বিপুল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশে-বিদেশে ঋণের দিকে ঝুঁকতে হবে।’ তার মতে, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। আবার দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে।
সরকার কী বলছে
দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন যে চ্যালেঞ্জিং হবে, বিএনপি সরকারও তা স্বীকার করছে। তবে ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করতে চায় সরকার বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি সম্প্রতি বলেছেন, ‘ইশতেহারে বলা হয়েছে যে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সেই অনুযায়ীই একটা রিভিউ করা হয়েছে।’ এ ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা একবারে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। রাশেদ আল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা কয়েকটা ধাপে এটা করবো। প্রথমেই বেতন বা বেসিকটা বাড়ানো হবে।’
এর আগে গত জুনে সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তব্যে নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবৎ একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী পহেলা জুলাই ২০২৬ হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।’
পে-স্কেল পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম দুই অর্থবছরে মূল বেতন ৫০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি এবং তৃতীয় বছরে ভাতা কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। সরকারের মতে, এভাবে ধাপে ধাপে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করলে অর্থনীতির ওপর তুলনামূলকভাবে চাপ কম পড়বে।



