বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির। ঢাকা বরাবরই জোর দিয়ে আসছে যে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। কিন্তু নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটি গৃহযুদ্ধে জর্জরিত, এবং রাখাইন রাজ্য এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে, মানবিক সহায়তার তহবিল হ্রাস পাচ্ছে এবং শিবিরগুলোর পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের নতুন বিএনপি সরকারের উচিত বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ও কূটনীতির ভিত্তিতে রোহিঙ্গা নীতি ঢেলে সাজানো।
বিএনপি সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ
গত ফেব্রুয়ারিতে ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, যার মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক উত্তরণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিককরণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব মোকাবিলা। দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলটি উচ্চাভিলাষী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এসেছে, বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলার লক্ষ্য। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুটি শীর্ষ অগ্রাধিকার না-ও হতে পারে, তবে দক্ষিণ সীমান্তের এই শরণার্থীদের অবহেলা করা গুরুতর ভুল হবে। শিবিরগুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতি শুধু রোহিঙ্গাদের কষ্ট বাড়াবে না, বরং স্থানীয় বাংলাদেশিদের ওপর চাপ ফেলবে এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করবে।
অতীতের শিক্ষা
২০১৬-১৭ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কূটনৈতিক পন্থায় সংকট সমাধানের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তার সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সই করে এবং জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারকে (ইউএনএইচসিআর) প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে। চীনের মধ্যস্থতাও চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরে যায়নি। মূল কারণ ছিল রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা ছাড়া ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়, এবং নেপিদো সেই নিশ্চয়তা দিতে রাজি ছিল না। এছাড়া, শেখ হাসিনার সরকার রোহিঙ্গাদের চলাচল, কাজ ও শিক্ষার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, যা প্রত্যাবাসনের পথ সুগম করার পরিবর্তে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় এবং আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) মতো সহিংস গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে।
শিবিরে কঠিন জীবনযাপন
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর শিবিরগুলোর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন কার্যক্রমে বার্ষিক ৬০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ আসত, যা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে (ডব্লিউএফপি) প্রতিটি শরণার্থীকে মাসে ১২ ডলার সমমূল্যের খাদ্য রেশন দিতে সাহায্য করত। কিন্তু বিশ্বজুড়ে অন্যান্য মানবিক সংকট, সাহায্যদাতাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় তহবিল সংকট দেখা দিয়েছে। গত এপ্রিলে ডব্লিউএফপি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শরণার্থীর জন্য খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে, ফলে কেউ কেউ এখন মাসে মাত্র ৭ ডলার সমমূল্যের রেশন পাচ্ছেন। শরণার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে—১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নতুন রোহিঙ্গার আগমন এবং বার্ষিক প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্মের কারণে শিবিরগুলো ঢাকার চেয়েও ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অধিকাংশ শরণার্থীর অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক। তারা শুধু মানবিক সংস্থার অধীনে 'স্বেচ্ছাসেবক' হিসেবে কাজ করতে পারে, কারণ সরকারের যুক্তি হলো আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তাদের স্থানীয় সমাজে মিশে যাওয়ার পথ তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক শরণার্থী শিবিরের ভেতরে ও বাইরে অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করছে, এবং স্থানীয় নিয়োগকর্তারা তাদের কম মজুরি দিচ্ছে। এতে স্থানীয়রা মনে করছে যে শরণার্থীরা তাদের চাকরি কেড়ে নিয়েছে, খাবারের দাম বাড়িয়েছে এবং অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। যদিও কিছু অভিযোগ সত্য, যেমন নির্মাণ, কৃষি ও মৎস্য খাতে মজুরি কমেছে, তবে বিদেশি সহায়তার একটি বড় অংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছেও গেছে।
শিবিরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অবনতি হচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে 'মিশন হারমোনি' বা অস্ত্রবিরতি ভেঙে পড়ছে, মূলত আন্তসীমান্ত মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতার কারণে। মে মাসের শুরুতে দুই রোহিঙ্গা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলে নিরাপত্তা বাহিনী যৌথ অভিযান শুরু করে এবং শীর্ষস্থানীয় সদস্যদের আটক করে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে, কারণ তারা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ঘৃণা করে এবং তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
সামনের পথের নকশা
জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন শরণার্থী কার্যক্রম এবং বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখন কম তহবিল নিয়ে দীর্ঘায়িত সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ। মানবিক সংস্থাগুলো শিবির ব্যবস্থাপনা ও সেবা প্রদান আরও সুবিন্যস্ত করতে পারে এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোর কাছে নেতৃত্ব ও তহবিল হস্তান্তর করতে পারে। সরকারের উচিত শরণার্থীদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া বা নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া, যা মানবিক সহায়তার ঘাটতি পুষিয়ে দেবে এবং প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করবে। শিবিরের ভেতরে বাজারের অনুমোদন এবং নগদ অর্থ স্থানান্তর বিবেচনা করা উচিত, যা পরিচালন ব্যয় কমাবে ও স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করবে।
শরণার্থী জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শিবির সম্প্রসারণ জরুরি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার টেকসই সামগ্রী দিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে, যা প্রতি দুই বছর পর বাঁশ ও ত্রিপল পরিবর্তনের পূর্ববর্তী নির্দেশনার চেয়ে উন্নত। নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে তিন গুণ বেশি খরচ হলেও দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী। তবে তহবিল ঘাটতির কারণে খুব কম বাসস্থান তৈরি হয়েছে। ভাসানচরের দ্বীপ শিবির বন্ধ করার পরিকল্পনা করা উচিত, যেখানে সেবা প্রদানের খরচ বেশি।
সরকারের উচিত নির্ভরযোগ্য রোহিঙ্গা বেসামরিক নেতৃত্বের জন্য পথ উন্মুক্ত করা এবং নিশ্চিত করা যে শিবির কর্তৃপক্ষ সশস্ত্র গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। বিএনপির ২০২৩ সালের নীতিমালায় 'নতুন, শিক্ষিত এবং ভবিষ্যৎ-মুখী বেসামরিক নেতৃত্ব' তৈরির কথা বলা হয়েছে। নারী ও মেয়েদের নেতৃত্বে উৎসাহিত করা জরুরি, বিশেষ করে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে ও মানবপাচার মোকাবিলায়।
রাখাইনের পরিবর্তিত পরিস্থিতি
শিবিরের অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য, কিন্তু সীমান্তের ওপারের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া না গেলে তা কার্যকর হবে না। নেপিদো ও আরাকান আর্মি যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় দ্রুত প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তে, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে কীভাবে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা যায়, তার ভিত্তি প্রস্তুত করা উচিত। নেপিদোর জান্তাকে উপেক্ষা করা যাবে না, কারণ তারা নাগরিকত্ব ও নথিপত্র প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। তবে রাখাইন রাজ্যের ওপর সামরিক বাহিনীর আর নিয়ন্ত্রণ নেই, এবং তারা রোহিঙ্গা নিপীড়নে মূল ভূমিকা পালন করেছে, তাই তাদের আন্তরিক অংশীদার হিসেবে দেখা কঠিন।
বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলো আরাকান আর্মির সঙ্গে, যারা রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের সঙ্গে দ্রুত গোপন কিন্তু অর্থপূর্ণ আলোচনা শুরু করা উচিত, যার লক্ষ্য হবে পারস্পরিক আস্থা তৈরি, সীমান্ত স্থিতিশীলতা, অনানুষ্ঠানিক মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্য, এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা। একই সঙ্গে, শিবিরের ভেতরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। বিএনপি সরকার ইতিমধ্যে দক্ষিণ বাংলাদেশ ও উত্তর রাখাইনের মধ্যে আধা-আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য পুনরায় চালু করেছে, যা সীমান্তের উভয় পাড়ের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে আরাকান আর্মির সঙ্গে নিঃশর্ত সহযোগিতা বাড়ানো উচিত নয়। গত দুই বছরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার শরণার্থী বাংলাদেশে এসেছে, যাদের অনেকেই আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। তাই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, সেবা ও জীবিকার অধিকার এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি থেকে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি আদায়ে চাপ দেওয়া উচিত।
কৌশল পরিবর্তনের জন্য সমর্থন গড়ে তোলা
এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিরোধ আসতে পারে। সমালোচকরা যুক্তি দিতে পারেন যে শরণার্থীদের কর্মসংস্থান ও টেকসই আশ্রয় দেওয়া স্থানীয়দের জন্য ক্ষতিকর এবং এটি তাদের সমাজে মিশে যাওয়ার কৌশল। আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবেও দেখা হতে পারে। এসব সমালোচনা মোকাবিলায় সরকারকে শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে যে, শরণার্থীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের নীতিগুলো মূলত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে। কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার ঝুঁকি—যেমন অবৈধ অর্থনীতি, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও সহিংসতা বৃদ্ধি—স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত।
জনসাধারণের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি করতে কর্মকর্তাদের চিন্তন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করা উচিত। রোহিঙ্গা ইস্যুকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার হাতিয়ার করা এড়াতে এবং সর্বদলীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করা জরুরি। কক্সবাজারে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রোধে সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু ও মৎস্যজীবীদের সুরক্ষার মতো পদক্ষেপ স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল করতে সাহায্য করতে পারে।
পরিশেষে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্বের তালিকায় রাখতে বাংলাদেশের বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করা উচিত। শরণার্থী কার্যক্রমের ব্যয় কমিয়ে আনার সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের প্রস্তুতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বহু বছর মেয়াদি প্রতিশ্রুতি আকর্ষণ করা যেতে পারে। আগামী মাসগুলো বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি ঢেলে সাজানোর এবং টেকসই পথনকশা তৈরির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। শরণার্থীদের কর্মসংস্থান নিয়মতান্ত্রিক করা, শিবিরের শাসনব্যবস্থা ও নিরাপত্তা উন্নত করা, গ্রহণযোগ্য বেসামরিক নেতৃত্ব তৈরি করা এবং আরাকান আর্মির সঙ্গে বিচক্ষণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখতে পারে।



