হামের উচ্চ সংক্রমণে জরুরি টিকাদান: ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় ১২ লাখ শিশুকে টিকা
বাংলাদেশে হামের ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে, যেখানে সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এই কর্মসূচি আগামীকাল রোববার থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রস্তুতি
সরকারি সূত্র থেকে জানা গেছে, জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এসব উপজেলার ৬ মাস বয়স থেকে ৫ বছর বয়সী মোট ১২ লাখ ৩ হাজার ২৬৭টি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য বিভাগ ও একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে উপজেলাগুলোর তালিকা পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে গতকাল রাতে টিকাবিষয়ক কারিগরি কমিটি নাইট্যাগের সভা হওয়ার কথা ছিল। আজও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে উচ্চপর্যায়ের সভা হওয়ার কথা রয়েছে। এই দুই সভায় আরও দু-একটি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উচ্চ সংক্রমণ হার ও প্রভাবিত এলাকাসমূহ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয় প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষে হামের সংক্রমণ ১৬ দশমিক ৮, যা সংস্থাটির মতে অনেক বেশি। সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে দক্ষিণের জেলা বরগুনায়, যেখানে এ বছর ২৬ শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং সংক্রমণ হার ২৯৫। এখানে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ৩৬ হাজার ৮৮ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
উচ্চ সংক্রমণ হারের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাবনা সদর উপজেলা, যেখানে ৩২ শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং সংক্রমণ হার ১৮০। এই জেলায় ৭২ হাজার ৮২৫ শিশু টিকা পাবে। তৃতীয় স্থানে আছে চাঁদপুর সদর উপজেলা, যেখানে ২৪ শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং সংক্রমণ হার ১৪৪। এখানে ৫৭ হাজার ৩২৮ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে।
অন্যান্য উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ, চাঁদপুরের হাইমচর, কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু, ঢাকার নবাবগঞ্জ, গাজীপুর সদর, যশোর সদর, ঝালকাঠির নলছিটি, মাদারীপুর সদর, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, সদর ও শ্রীনগর, ময়মনসিংহের ত্রিশাল, সদর ও ফুলপুর, নাটোর সদর, নেত্রকোনার আটপাড়া, নওগাঁর পোরশা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, সদর ও ভোলাহাট, পাবনার ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও বেড়া, রাজশাহীর গোদাগাড়ী এবং শরীয়তপুরের জাজিরা।
চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতি
একজন সিভিল সার্জন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী জরুরি টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে তাঁর উপজেলায় জনবলসংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাঠপর্যায়ে টিকা দেন সাধারণত স্বাস্থ্য সহকারী, কিন্তু এ জেলায় ৩০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্য সহকারীর পদ শূন্য রয়েছে, যা কর্মসূচি সফল করতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান ও মৃত্যুর হার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, ২ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ৩ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহজনক ৯৪৭ জন রোগী সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৪২ শিশুর হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে।
এ বছর ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত সন্দেহজনক ৫ হাজার ৭৯২ জনের হামের পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৭১ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে। একই সময়ে ৯৪ জনের সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯ জনের হামে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ জনের বেশি বলে জানিয়েছে, যা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি হামের বিস্তার রোধ ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকরী বাস্তবায়নের উপরই এর সাফল্য নির্ভর করবে।



