হাম সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকারের বিশেষ উদ্যোগ: ৬ মাস বয়স থেকেই টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত
দেশজুড়ে হাম সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় সরকার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নিয়মিত সুপারিশের বাইরে গিয়ে ছয় মাস বয়স থেকেই শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে জুন মাসের শুরুতে এক মাসব্যাপী একটি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (৩০ মার্চ) অনুষ্ঠিত জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাবে দেখা গেছে, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ঢাকা শহরসহ রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় এমন ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র এই বিশেষ কর্মসূচির জন্য প্রযোজ্য হবে বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের বক্তব্য
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ বলেন, “দেশে হাম সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষ পরিস্থিতিতে ছয় মাস বয়সী শিশুদের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি আগের মতোই চলবে, যেখানে ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ দেওয়া হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই বিশেষ কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ ও গবেষণা
বর্তমানে সারা বিশ্বে ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকা দেওয়া হয়। নিয়মিত কর্মসূচিতে বয়সসীমা অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে হালিমুর রশীদ বলেন, “এ বিষয়ে ডব্লিউএইচওর নির্দিষ্ট সুপারিশ নেই এবং বিষয়টি এখনও গবেষণাধীন রয়েছে।”
টিকার কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত
বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও ইমিউনোলজিস্ট ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, “নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। ৯ মাস বয়সে টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ কার্যকর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কোনো টিকাই শতভাগ কার্যকর নয়।” তিনি আরও বলেন, জরুরি পরিস্থিতি বা প্রাদুর্ভাবের সময় ৯ মাসের আগেও টিকা দেওয়া যেতে পারে, তবে এতে কার্যকারিতা কমে যায়। “৬ মাস বয়সে টিকা দিলে এর কার্যকারিতা ৫০ শতাংশের কম থাকে। এ কারণেই নিয়মিত সূচি ৯ মাস থেকে শুরু হয়,” বলেন তিনি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “সংকট পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী আগাম টিকা দেওয়া যায় এবং বর্তমানে বাংলাদেশ এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যেই রয়েছে।” চ্যালেঞ্জের মাত্রা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ শিশু জন্ম নেয়, যার মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার শিশু পর্যাপ্ত সুরক্ষা পাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনা উচিত।
টিকা সংগ্রহ ও আর্থিক বরাদ্দ
ডা. তাজুল ইসলাম আরও জানান, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ টিকা সহায়তা আসে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গাভি) থেকে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ গাভির কাছে টিকা চেয়েছিল, ২০২৪ সালে প্রায় ২ কোটি শিশুর জন্য টিকার চালান এলেও বিভিন্ন কারণে তা ব্যবহার করা হয়নি। সাম্প্রতিক সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে টিকা সংগ্রহে জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তুতি
একইসঙ্গে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত হাসপাতাল সুবিধা চালু, আইসিইউ বেড ও ভেন্টিলেটর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চিকিৎসা সহায়তা জোরদারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত বাড়ছে হাম সংক্রমণ।
প্রাদুর্ভাবের বিস্তার ও আক্রান্তের সংখ্যা
ইপিআই কর্মকর্তারা জানান, এই প্রাদুর্ভাব আর নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ইপিআইয়ের উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, “এবার আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে দেড় হাজার ছাড়িয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক তথ্য এখনও চূড়ান্ত হয়নি।” এই পরিস্থিতিতে সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।



