প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একাধিক প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন।
প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহ
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি চিকিৎসকদের অবসর বয়স বৃদ্ধি, এমবিবিএস পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণ উন্নত করা, জাতীয় রেফারেল সিস্টেম চালু, ক্লাসের আকার কমানো, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো, পুরনো ডিএমসি হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ এবং সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
“ঢাকা মেডিকেল কলেজের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ” শীর্ষক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সমাধান চিকিৎসক সম্প্রদায়ের কাছ থেকেই আসা উচিত। ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণ উন্নত করার প্রস্তাবে তিনি জানতে চান কেন ইন্টার্নরা পর্যাপ্ত ব্যবহারিক সুযোগ পাচ্ছে না।
এক শিক্ষার্থী জানান, পোস্টগ্রাজুয়েট ট্রেইনিদের বড় সংখ্যা ইন্টার্নদের হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা সীমিত করে। তখন প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, “এর সমাধান কী?” শিক্ষার্থী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ইন্টার্নদের আরও সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সমাধান তোমাদের কাছেই আছে। তোমাদের একসঙ্গে বসে তা খুঁজে বের করতে হবে।”
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা
প্রধান শহরের বাইরে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার উপজেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা আগামী পাঁচ বছরে ৫০ থেকে ১০০-এ উন্নীত করতে কাজ করছে। এক চিকিৎসক বলেন, গ্রামের রোগীরা সরাসরি ডিএমসি হাসপাতালে চলে আসে কারণ সঠিক রেফারেল ব্যবস্থা নেই। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা যদি ভোট চাইতে গ্রামে যেতে পারি, তাহলে চিকিৎসকরা কেন চিকিৎসা দিতে সেখানে যেতে পারেন না?”
তারিক রহমান জোর দিয়ে বলেন, তৃণমূলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা টারশিয়ারি হাসপাতালের চাপ কমাবে। তিনি চিকিৎসকদের রোগীদের প্রতি দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। “আমি যখন অসুস্থ হয়ে তোমার কাছে আসি, তুমি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে যাও। এটা একটা বড় দায়িত্ব,” বলেন তিনি।
অবসর বয়স বৃদ্ধির প্রস্তাব
পূর্বে ডিএমসির প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও ময়মনসিংহ-৭ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. মাহবুবুর রহমান সরকারি চিকিৎসকদের অবসর বয়স বাড়ানোর আহ্বান জানান। “যুক্তরাজ্যের মতো দেশে চিকিৎসকরা ৬৫ বা ৬৭ বছর বয়সে অবসর নেন। এখানে আমরা ৫৯ বছর বয়সে অবসর নিই। পঞ্চান্ন এখন আর বয়স নয়, কারণ আয়ু বেড়েছে। আমি মনে করি চিকিৎসকদের অবসর বয়স পুনর্বিবেচনা করা উচিত যাতে তারা আরও বেশি দিন মানুষের সেবা করতে পারেন,” তিনি বলেন।
হালকা মেজাজের মন্তব্য
আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী একটি হালকা মন্তব্য করেন যা উপস্থিতদের হাসি ও করতালি আকর্ষণ করে। মাহবুবুর রহমান বলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যখাতের বিষয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি আছে। তখন তারিক রহমান হেসে বলেন, “আপনি বললেন আমার মনে স্বাস্থ্য আছে। আমার মনে স্বাস্থ্য নেই, উনি,” পাশে বসা স্ত্রী ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জুবাইদা রহমানের দিকে ইশারা করে।
উপস্থিতরা জোরে করতালি দেয় এবং মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমরা সত্যিই গর্বিত।”
শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব
বর্তমান ডিএমসি শিক্ষার্থী সাদিয়া তাসনিম একটি নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেন, কারণ ১৯০৪ সালে নির্মিত বিদ্যমান কাঠামো আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য অনুপযুক্ত। তিনি ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ উন্নত করতে বার্ষিক শিক্ষার্থী ভর্তি কমানোর এবং মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা সংস্কারের প্রস্তাব দেন।
অপর শিক্ষার্থী জোহায়ের ইসলাম বিদ্যমান বিষয়ভিত্তিক এমবিবিএস পাঠ্যক্রমের পরিবর্তে উন্নত দেশে অনুসৃত সমন্বিত মডিউলভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন। তিনি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক চাপ কমাতে ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে সপ্তাহে দুই দিন ছুটির অনুরোধ করেন।
প্রধানমন্ত্রী জবাবে বলেন, “আমিও সপ্তাহে সাত দিন কাজ করি,” হাসি দিয়ে।
চিকিৎসকদের চাপ
রেসিডেন্ট সার্জন ডা. মীর রাশেক আলম আবি ডিএমসি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ওপর তীব্র চাপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাঁচজন মেডিকেল অফিসারকে প্রায়ই এক দিনে ৪০০-এর বেশি বহির্বিভাগের রোগী দেখতে হয়, ফলে প্রতি রোগীর জন্য পাঁচ মিনিটেরও কম সময় পাওয়া যায়। তিনি যুক্তি দেন, কার্যকর জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থা চালু করলে টারশিয়ারি হাসপাতালের বোঝা কমবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রাক্তন শিক্ষার্থী, চিকিৎসক ও গবেষকরা। তারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।



