আমাদের গায়ের রং, চুল কিংবা চোখের রং সাধারণত নির্ধারিত হয় মেলানিন নামের একটি রঞ্জকের মাধ্যমে। কিন্তু জন্মগত কারণে যখন শরীরে এই মেলানিন পর্যাপ্ত পরিমাণে অথবা একেবারেই তৈরি হয় না, তখন তাকে বলা হয় অ্যালবিনিজম। এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয়, বরং একটি বংশগত-জিনগত বৈশিষ্ট্য।
অ্যালবিনিজমের বৈশিষ্ট্য
অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ত্বক, চুল ও চোখ সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি ফ্যাকাশে বা সাদা হয়ে থাকে। অনেকের চোখের মণি হালকা নীল, ধূসর কিংবা লালচে আভাযুক্ত দেখা যায়। তবে অ্যালবিনিজমের মাত্রা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারও শরীরে কিছুটা মেলানিন তৈরি হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রায় একেবারেই হয় না।
দৃষ্টিজনিত চ্যালেঞ্জ
শুধু গায়ের রং আলাদা হওয়া নয়, বাস্তবে অ্যালবিনিজম আক্রান্ত ব্যক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দৃষ্টিজনিত সমস্যা। অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিকের তুলনায় দুর্বল হয়। চোখে আলো বেশি লাগা, দূরের জিনিস স্পষ্ট না দেখা, চোখ কাঁপা বা চোখের সমন্বয়জনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে তাঁদের শিক্ষা, কর্মজীবন ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
ত্বকের সুরক্ষা
ত্বকে মেলানিন কম থাকায় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে তাঁদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাও কম থাকে। এ জন্য অ্যালবিনো ব্যক্তিদের ত্বক সহজে রোদে পুড়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে ত্বকের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। তাই বাইরে বের হলে সানস্ক্রিন ব্যবহার, ছাতা বা টুপি পরা এবং রোদ এড়িয়ে চলা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক চ্যালেঞ্জ ও সচেতনতা
অ্যালবিনিজম নিয়ে সমাজে নানা ধরনের ভুল ধারণা ও কুসংস্কারও রয়েছে। বিভিন্ন দেশে অ্যালবিনো মানুষদের বৈষম্য, উপহাস বা সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়। অথচ তাঁরা অন্য সবার মতোই স্বাভাবিক মানুষ, যাঁদের মেধা ও সম্ভাবনা সমান। তাঁদের আলাদা করে দেখার কোনো কারণ নেই।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞান অ্যালবিনিজম পুরোপুরি নিরাময়ের উপায় খুঁজে পায়নি। তবে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, উপযুক্ত চশমা ব্যবহার, ত্বকের সুরক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এই মানুষগুলোর জীবন অনেক সহজ ও নিরাপদ করতে পারে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের ইতিবাচক সহযোগিতা অ্যালবিনো শিশুদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক অ্যালবিনিজম সচেতনতা দিবস
প্রতিবছর জুন মাসে আন্তর্জাতিক অ্যালবিনিজম সচেতনতা দিবস পালিত হয়। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো অ্যালবিনো মানুষদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং তাদের সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা।
ডা. সাইফ হোসেন খান, সহকারী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা



