হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও শিশুদের মৌসুমী সর্দি-জ্বরে বেশি আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা
দেশের প্রায় সব জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব চলমান থাকলেও বর্তমানে শিশুরা হামের চেয়ে নাক দিয়ে পানি পড়াসহ মৌসুমী সর্দি ও জ্বরে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ জানিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে শিশু বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোনো অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
বর্তমান মৌসুমে সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের ব্যাপক হারে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভিভাবকরা প্রায়শই নিজেরাই ওষুধের দোকান থেকে অথবা একশ্রেণির চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সাধারণ সর্দি-কাশি, জ্বর ও নাকে পানি পড়ার উপসর্গে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে শিশুদের আরোগ্য লাভের চেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কাই বেশি থাকে।
হামের লক্ষণ চেনা ও আতঙ্ক পরিহার
ঋতু পরিবর্তনের ফলে সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বরের পাশাপাশি নাক দিয়ে পানি পড়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে কিংবা শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে আগত শিশুদের সংখ্যাই বেশি। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন, হাম ভেবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই, কারণ ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাবের কোনো সম্পর্ক নেই।
দেশের জ্যেষ্ঠ শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা ব্যাখ্যা করেছেন, "ঋতু পরিবর্তনের ফলে সর্দি, কাশি, জ্বর, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। জ্বরের সঙ্গে নাক দিয়ে পানি পড়া ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমণ নয়। ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে জ্বর হবে, নাক দিয়ে পানি পড়বে না। সর্দি, কাশি, জ্বর ও নাক দিয়ে পানি পড়লেই হামে আক্রান্ত নয়। চার দিনের জ্বরের সঙ্গে দেহে লালচে র্যাশ দেখা দিলে হামের লক্ষণ কিংবা আক্রান্ত হয়েছে বলে শনাক্ত করা হয়।"
চিকিৎসকদের সুপারিশ ও সচেতনতা প্রচারণা
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সফি উদ্দিন বলেছেন, "সর্দি, কাশি, জ্বর ও নাকের পানি পড়ার উপসর্গ হলে শুধু প্যারাসিটামল সিরাপ খাওয়াবেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছি।" তিনি উল্লেখ করেছেন যে, প্রতিদিন তার প্রাইভেট চেম্বারে প্রচুর সংখ্যক সর্দি, কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত শিশু আসলেও হামের উপসর্গ নিয়ে আসার সংখ্যা খুবই কম।
অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে তিনি আতঙ্কিত না হয়ে শুধু প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনের পাশাপাশি যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া হামের টিকা দেওয়ার পাশাপাশি এই বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অভিভাবকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানোর সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য ও টিকাদান কার্যক্রম
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেছেন, "ঋতু পরিবর্তনের কারণে সর্দি, কাশি ও জ্বর বেশি হচ্ছে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।" তিনি আরও জানিয়েছেন যে, হাম প্রতিরোধে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম দেশব্যাপী অব্যাহত রয়েছে, যা এই রোগের বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সর্বোপরি, বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের জন্য নিম্নলিখিত পরামর্শগুলো দিয়েছেন:
- সর্দি-জ্বরের সাধারণ উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক এড়িয়ে চলুন।
- হামের সঠিক লক্ষণ চিনতে শিখুন এবং অহেতুক আতঙ্কিত হবেন না।
- শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করুন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
- প্রয়োজনে শুধু প্যারাসিটামল সিরাপ ব্যবহার করুন এবং পর্যাপ্ত যত্ন নিন।



