হামের প্রকোপে উদ্বিগ্ন মায়েরা, ঢাকায় ছুটে এসে সন্তানদের টিকা দিচ্ছেন
হামের প্রকোপে উদ্বিগ্ন মায়েরা ঢাকায় ছুটে এসে টিকা দিচ্ছেন

হামের প্রকোপে উদ্বিগ্ন মায়েরা ঢাকায় ছুটে এসে সন্তানদের টিকা দিচ্ছেন

দেশে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন মায়েরা সন্তানদের টিকা দিতে ঢাকার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভিড় করছেন। বুধবার সকালে রাজধানীর মিরপুরের আরামবাগ এলাকায় অবস্থিত নগর মাতৃসদন ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দেখা গেছে, অনেক মা দূরদূরান্ত থেকে এসে হামসহ ইপিআইয়ের আওতায় বিভিন্ন টিকা নিচ্ছেন।

ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছেন রিপা আক্তার

স্বামী-সন্তান নিয়ে ময়মনসিংহের তারাকান্দায় থাকেন রিপা আক্তার। ছেলে সাইফান ইসলামকে হামের টিকা দিতে রিপা ছুটে এসেছেন ঢাকার মিরপুরে তাঁর বাবার বাড়িতে। বুধবার সকালে মিরপুরের আরামবাগ আবাসিক এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটির একটি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছেলেকে হামের টিকা দেন তিনি। টিকা দিতে পেরে মনের মধ্যে থাকা আতঙ্ক কিছুটা দূর হয়েছে বলেও জানান এই মা।

রিপার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গর্ভধারণের কয়েক মাস পর তিনি মিরপুরে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। গর্ভকালীন সব সেবা এবং সন্তানের জন্মের পর প্রয়োজনীয় টিকাগুলো বাবার বাড়ির কাছের ওই নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই নিয়মিত নিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে আবার স্বামীর বাড়ি ময়মনসিংহে ফিরে যান তিনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সম্প্রতি হামের প্রকোপ বৃদ্ধির খবরে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ, গত ১২ মার্চ ছিল তাঁর ছেলের হামের দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার তারিখ। কিন্তু ঈদের আগে আর ঢাকা না আসায় ওই টিকা সময়মতো দেওয়া হয়নি। তবে হামের প্রকোপ বৃদ্ধির পর টিকা দিতে এলাকায় খোঁজ নিয়েছিলেন। জানতে পারেন এলাকায় টিকা দেওয়া হয় প্রতি মাসে নির্ধারিত এক দিন, যা এপ্রিলের শেষে হবে।

আতঙ্কের মধ্যে আর অপেক্ষা করতে চাননি রিপা, ছেলেকে নিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। তিনি বললেন, ‘দেরি না কইরা চলে আসছি। এনে আইলাম, পোলার টিকা দিলাম। এহন মনডা একটু হালকা লাগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘টিকা দিলে আর দুশ্চিন্তা থাকে না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খুলনা থেকে ঢাকায় বেড়াতে এসে টিকা দিয়েছেন তাকিয়া রহমান

ঢাকায় বেড়াতে এসে ছেলেকে হামের টিকা দিয়েছেন খুলনার তাকিয়া রহমান। তাকিয়ার ছেলের টিকা কার্ডটি খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায়। ঈদে ঢাকায় মিরপুরে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। এই ফাঁকে ছেলে উসাফ উজ জামানের টিকা দিয়েছেন তিনি।

তাকিয়া রহমান বলেন, ‘আমরা হামটাকে অনেক লাইটলি (হালকভাবে) নিতাম। এটা নিয়ে আমরা এত বেশি সচেতন ছিলাম না। ঈদের পর থেকে দ্রুতই অনেক বাচ্চা আক্রান্ত হচ্ছে, অনেকে মারাও যাচ্ছে। এটা মায়েদের জন্য খুবই আতঙ্কের বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোনো দেরি করিনি। আজকেই টিকা দেওয়ার তারিখ ছিল। টিকা দিতে পেরে এখন আমার ভালো লাগছে। টিকা নিয়ে অনেক টেনশনে ছিলাম।’

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা নিতে মায়েদের ভিড়

ওই নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ক্লিনিক ম্যানেজার তামজিদা সুলতানা বলেন, সকাল থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঁচজন অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের হামের টিকা দিয়েছেন। এর বাইরে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় নিয়মিত ৯টি টিকা নিতে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনেকেই এসেছেন।

মিরপুরের দারুস সালামের বর্ধনবাড়ী এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটির আরেকটি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। বুধবার দুপুরে ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, অনেক মায়েরাই তাঁদের সন্তানদের নিয়ে হামের টিকা দিতে আসছেন। এ ছাড়া অন্যান্য টিকা দিতে ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতেও ওই কেন্দ্রে যাওয়া নারীদের কিছুটা ভিড় দেখা গেছে।

সেখানে কথা হয় গৃহিণী আঁখি আক্তারের সঙ্গে। তিনি মেয়ে হুমায়রা আক্তারকে হামের টিকা দিয়েছেন। আঁখি আক্তার বলেন, ‘মায়েদের সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা তাঁর সন্তানকে নিয়ে। সন্তানের খারাপ কিছু কোনো মা-ই মেনে নিতে পারেন না। হামের টিকা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু টিকাটি দিতে পেরে ভালো লাগছে।’ তিনি নির্ধারিত তারিখেই টিকা দিয়েছেন বলে জানান।

স্বাস্থ্যকর্তাদের বক্তব্য

ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মকর্তা সারোয়াত জাহান বলেন, হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে একধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন হয়ে টিকার জন্য দূরদূরান্ত থেকে আসছেন। মুঠোফোনে টিকা কার্ডের ছবি দেখালেই অনলাইনে তা যাচাই করে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে হামের টিকার কোনো ঘাটতি নেই, পর্যাপ্ত রয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, তাদের আওতাধীন ১০টি অঞ্চলের মধ্যে ৬টি অঞ্চলে নগর মাতৃসদন ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র মিলিয়ে মোট ৩৬টি সেবাকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সব দিন টিকাসেবা দেওয়া হয়। আর স্থায়ী ইপিআই টিকাকেন্দ্র রয়েছে ৬০টি। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ সেবাকেন্দ্র (স্যাটেলাইট সেন্টার) রয়েছে, যেখানে ইপিআই সুপারভাইজাররা বিভিন্ন ওয়ার্ড এলাকায় নির্ধারিত জায়গায় মাসে দুইবার এই সেবা দেন। এর বাইরে কোনো অভিভাবক যদি সন্তানদের টিকা দেওয়া ভুলে যান বা দিতে না পারেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাড়ি গিয়ে টিকা দিয়ে আসা হয়।

ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ঢাকা উত্তর সিটিতে হামের টিকার (এম-আর) কোনো সংকট নেই। স্বাভাবিকভাবেই টিকাদান কার্যক্রম চলমান। নিয়ম অনুযায়ী সবাইকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে আগামী রোববার থেকে সরকার বিশেষ যে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন এলাকায় টিকা কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকে ঢাকায় পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছে বেড়াতে এসেও হামের টিকা নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ও সহজলভ্য টিকাদান নিশ্চিত না হলে শিশুদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।