শিশুদের অতিরিক্ত লালা পড়া: স্বাভাবিক নাকি স্বাস্থ্যগত সমস্যার লক্ষণ?
শিশুদের অতিরিক্ত লালা পড়া: কারণ ও প্রতিকার

শিশুদের অতিরিক্ত লালা পড়া: স্বাভাবিক নাকি স্বাস্থ্যগত সমস্যার লক্ষণ?

অনেক অভিভাবক শিশুদের মুখ থেকে লালা পড়ার বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন, বিশেষ করে যখন এটি অতিরিক্ত মাত্রায় হয়। শিশুর পোশাক বা বালিশ বারবার ভিজে যাওয়া, মুখের চারপাশে র‍্যাশ দেখা দেওয়া বা বাজে গন্ধ হওয়া হলে এই উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে লালা পড়া প্রায়ই একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যার ইঙ্গিতও দিতে পারে। তাই বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।

লালা পড়ার স্বাভাবিক কারণ ও সময়কাল

জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই শিশুর বিভিন্ন লালাগ্রন্থি সক্রিয় হতে শুরু করে। সাধারণত ৪ থেকে ৬ মাস বয়স থেকে লালার পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং অনেক শিশুর মুখ থেকে লালা পড়তে দেখা যায়। ১৮ মাস থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত কিছুটা লালা পড়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়। এই সময়ে শিশুর মুখের পেশি ও নার্ভাস সিস্টেমের বিকাশ ঘটে, যা লালা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

দাঁত ওঠার সময় লালা বাড়ার কারণ

শিশুর অতিরিক্ত লালা পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দাঁত ওঠা। ছয় মাস বয়সের পর শিশুর প্রথম দাঁত উঠতে শুরু করলে মাড়িতে অস্বস্তি ও প্রদাহ সৃষ্টি হয়, ফলে লালার উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এ সময় শিশুরা বিভিন্ন বস্তু মুখে দিতে চায়, চিবানোর চেষ্টা করে বা মাড়ি দিয়ে কামড়ানোর প্রবণতা দেখায়, যা লালা পড়ার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে তোলে।

কখন সতর্ক হতে হবে?

কিছু স্বাস্থ্যগত কারণেও শিশুদের অতিরিক্ত লালা পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • মুখের ঘা বা সংক্রমণ
  • টনসিল বা গলার সমস্যা
  • সর্দি–কাশি বা ঠান্ডাজনিত সংক্রমণ
  • দাঁত বা মাড়ির প্রদাহ
  • পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা ও কৃমির সংক্রমণ

এছাড়াও, স্নায়বিক সমস্যার কারণে লালা নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সেরিব্রাল পালসি বা অন্যান্য নিউরোলজিক্যাল রোগে আক্রান্ত শিশুরা লালা গিলতে অক্ষম হতে পারে, ফলে তা মুখ দিয়ে পড়ে যায়।

ঘরোয়া যত্ন ও প্রতিকারের উপায়

শিশুর অতিরিক্ত লালা নিয়ন্ত্রণে কিছু সহজ অভ্যাস বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে:

  1. শিশুর মুখ ও চিবুক সব সময় পরিষ্কার ও শুকনা রাখুন। লালা পড়লে নরম কাপড় দিয়ে মুছে দিন, যাতে ত্বকের জ্বালা বা র‍্যাশ কমে।
  2. প্রয়োজনে বেবি ক্রিম বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন, যা ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
  3. শিশুকে ধীরে ধীরে শক্ত খাবার চিবাতে শেখান। এতে মুখের পেশি শক্তিশালী হয় এবং লালা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?

যদি দুই বছরের পরও শিশুর মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা পড়তে থাকে, অথবা এর সঙ্গে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই শিশুবিশেষজ্ঞ বা দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:

  • গিলতে সমস্যা হওয়া
  • খাওয়ার সময় কষ্ট অনুভব করা
  • বারবার সংক্রমণ দেখা দেওয়া
  • কথা বলতে দেরি হওয়া
  • জিবের অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা

শেষ কথা

শিশুদের লালা পড়া অনেক ক্ষেত্রেই একটি স্বাভাবিক বিষয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি নিজে থেকেই কমে যায়। তবে, এর সঙ্গে অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। সচেতনতা ও সময়মতো পদক্ষেপ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক: ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ, কলাবাগান রাজ ডেন্টাল সেন্টার ও পান্থপথ রাজ ডেন্টাল ওয়ার্ল্ড, ঢাকা