স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হাতে ফার্মা এক্সপোর উদ্বোধন, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং প্রযুক্তি প্রদর্শিত
রাজধানীর পূর্বাচলে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে তিন দিনব্যাপী ১৭তম এশিয়া ফার্মা এক্সপোর উদ্বোধন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আজ রোববার সকালে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ওষুধ শিল্প সমিতির নেতৃবৃন্দ ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই) এই আয়োজনের দায়িত্বে রয়েছে।
প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি
এবারের প্রদর্শনীতে ২০টির বেশি দেশের চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এখানে ফার্মাসিউটিক্যাল প্রসেসিং ও প্যাকেজিং প্রযুক্তি, এপিআই ও এক্সিপিয়েন্টস, অ্যানালিটিক্যাল যন্ত্রপাতি, ক্লিনরুম সিস্টেম, পানি ব্যবস্থাপনা এবং টার্নকি প্রজেক্ট সেবাসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শিত হচ্ছে।
ভারতের প্রতিষ্ঠান বিলকেয়ার রিসার্চ তাদের উদ্ভাবনী প্যাকেজিং প্রযুক্তি উপস্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে যে তারা পলিভিনাইল ক্লোরাইড বা পিভিসি মুক্ত প্যাকেজিং তৈরি করেছে, যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব। বিলকেয়ার রিসার্চের এদেশীয় পরিচালক জাহিদ হাসান জানান, এই প্রযুক্তির প্যাকেজিং খরচ কিছুটা বেশি হলেও এটি নকল প্রতিরোধী, যা ওষুধের নিরাপত্তা বাড়ায়।
স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান
প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া জেনট্রি ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ওষুধ তৈরির মূল কাঁচামাল অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) সরবরাহ করে। অন্যদিকে, প্রিসিসা টেকনো ট্রেড লিমিটেড ওষুধশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্নকি প্রজেক্ট বা সম্পূর্ণ প্রকল্প সমাধান দেয়। এই দুই প্রতিষ্ঠান দেশের ৮০টির বেশি ওষুধশিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছে।
প্রিসিসা টেকনো ট্রেডের ব্যবসা উন্নয়নের প্রধান তাহমিদ হাসান বলেন, "একটি ওষুধশিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরির নকশা থেকে উৎপাদন পর্যন্ত সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়। একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে ৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে, এবং অধিকাংশ যন্ত্রাংশ চীন, ইউরোপ ও ভারত থেকে আমদানি করা হয়।"
দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন
দেশীয় প্রতিষ্ঠান সুইস বায়োহাইজেনিক ইকুইপমেন্ট ফার্মাসিউটিক্যাল, ভ্যাকসিন, বায়োটেক শিল্পের জন্য হাইজেনিক পদ্ধতির প্রায় ৬০ ধরনের যন্ত্রাংশ তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানের উপব্যবস্থাপক মো. মাহমুদুল হাসান জানান, তারা নিজেদের নকশা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব যন্ত্র উৎপাদন করছে, যা আমদানিকৃত যন্ত্রের তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ সস্তা।
প্রদর্শনীতে ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি যেমন ব্লেন্ডার, গ্র্যানুলেটর, ট্যাবলেট পাঞ্চিং মেশিন, ক্যাপসুল ফিলিং মেশিন, এবং কাঁচামাল যেমন এপিআই ও এক্সিপিয়েন্টস প্রদর্শিত হচ্ছে। এছাড়া, কিছু প্রতিষ্ঠান শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) ও ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) সেবা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও শিল্প নেতাদের বক্তব্য
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "স্বাস্থ্য খাতে নানা সংকট রয়েছে, তবে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি মেনে নেওয়া হবে না।" তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির তাঁর বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "দেশের ওষুধশিল্পে শীর্ষ ১০০ কোম্পানির মধ্যে ৩৫টি দেউলিয়া হয়ে গেছে, আরও ৩০টি সংগ্রাম করছে এবং মাত্র ৩০টি স্থিতিশীল। আগামী দুই বছরে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রযুক্তি ও মান উন্নয়নে সাহায্য করা হবে, যার জন্য সরকারের সঠিক নীতি সহায়তা প্রয়োজন।"
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. জাকির হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ এবং বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার।
এই প্রদর্শনীটি ওষুধ শিল্পের আধুনিকীকরণ ও স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



