ক্লেপটোম্যানিয়া: অদম্য চুরির তাড়নায় ভোগা মানুষের মানসিক যন্ত্রণা
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাব সহকারী হিসেবে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী রাশেদ (ছদ্মনাম) তার সহকর্মীদের কাছে ভদ্র, দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তিনি নিজেরই আচরণ নিয়ে গভীর অস্বস্তিতে ভুগছেন। হঠাৎ করেই তার মধ্যে অফিসের ক্যাশবক্স থেকে সামান্য টাকা বা সহকর্মীর টেবিলে রাখা ছোটখাটো জিনিস তুলে নেওয়ার অদম্য ইচ্ছা জাগে, যদিও সেই টাকা বা জিনিসের তার কোনো প্রয়োজনই নেই।
চুরির আগে ও পরে মানসিক দ্বন্দ্ব
চুরি করার আগে রাশেদের ভেতরে এক ধরনের তীব্র অস্থিরতা কাজ করে, আর কাজটি সম্পন্ন করার পর সাময়িক স্বস্তি আসে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় অপরাধবোধ, লজ্জা এবং আত্মগ্লানি। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আচরণ প্রায়ই ক্লেপটোম্যানিয়া নামের একটি মানসিক ব্যাধির লক্ষণ হতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোসহ বিশ্বব্যাপী কম নয়।
ক্লেপটোম্যানিয়া কী?
ক্লেপটোম্যানিয়া হলো এমন এক ধরনের মানসিক সমস্যা, যেখানে ব্যক্তি চুরি করার প্রবল তাড়নাকে দমন করতে পারেন না। সাধারণ চুরির সঙ্গে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: এখানে চুরি করা জিনিসের আর্থিক মূল্য বা ব্যক্তিগত প্রয়োজন সাধারণত গুরুত্ব পায় না। অনেক সময় তুচ্ছ কোনো জিনিস—যেমন একটি কলম, সেফটিপিন বা ছোটখাটো বস্তু—নিয়ে নেওয়াই হয়ে ওঠে প্রধান বিষয়। গবেষণা অনুযায়ী, এই সমস্যা সাধারণত কিশোর বা তরুণ বয়সে শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।
সমস্যার বিস্তার ও প্রকৃতি
ক্লেপটোম্যানিয়ায় আক্রান্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ ধরা পড়ার ভয়, সামাজিক লজ্জা বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেকেই বিষয়টি গোপন রাখেন। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পশ্চিমা বিশ্বের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়াতেও এ ধরনের সমস্যা ব্যাপক। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ ক্লেপটোম্যানিয়ার ঘটনা রিপোর্ট করা হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্লেপটোম্যানিয়া ও সাধারণ চুরির পার্থক্য
বাহ্যিকভাবে দুটি বিষয় একই রকম মনে হলেও এর পেছনের উদ্দেশ্য আলাদা। সাধারণ চুরির ক্ষেত্রে ব্যক্তি পরিকল্পনা করে এবং নিজের লাভ বা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে জিনিসটি নেয়, যেখানে অর্থনৈতিক সুবিধা প্রধান ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে ক্লেপটোম্যানিয়ার ক্ষেত্রে চুরি প্রায়ই হঠাৎ ঘটে এবং এটি মূলত একটি অদম্য মানসিক তাড়নার ফল, যেখানে ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারেন না কেন এমন করছেন।
ক্লেপটোম্যানিয়ার লক্ষণসমূহ
এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট আচরণ দেখা যায়:
- প্রয়োজন নেই এমন জিনিস চুরি করার তীব্র ইচ্ছা
- চুরি করার আগে তীব্র চাপ বা উদ্বেগ অনুভব করা
- চুরি করার পর সাময়িক আনন্দ বা স্বস্তি পাওয়া
- পরে অপরাধবোধ, লজ্জা বা অনুশোচনায় ভোগা
- রাগ, প্রতিশোধ বা বিভ্রমের কারণে চুরি না করা
- কখনও অপরাধবোধে চুরি করা জিনিস ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা
ক্লেপটোম্যানিয়ার সম্ভাব্য কারণ
এই ব্যাধির নির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে মনোবিজ্ঞানীরা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা উল্লেখ করেন:
- মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা: মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবের নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট হলে এমন তাড়না তৈরি হতে পারে।
- অন্যান্য মানসিক সমস্যার প্রভাব: অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি), মুড ডিসঅর্ডার, তীব্র মানসিক চাপ বা মাদকাসক্তির সঙ্গে ক্লেপটোম্যানিয়া দেখা যেতে পারে।
- বংশগত কারণ: পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও একই ধরনের সমস্যা থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চিকিৎসা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
ক্লেপটোম্যানিয়া অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হলেও চিকিৎসার মাধ্যমে এর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিভিন্ন আচরণগত থেরাপি, যেমন চুরি করার সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতি নিয়ে ভাবতে শেখানো, তাড়না এলে বিকল্প আচরণ করার অনুশীলন, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখানো ইত্যাদি কার্যকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্লেপটোম্যানিয়ার সবচেয়ে বড় বাধা হলো সামাজিক লজ্জা ও ভুল ধারণা, যেখানে অনেকেই এটিকে কেবল অপরাধ হিসেবে দেখেন। তবে বাস্তবতা হলো—এটি একটি মানসিক ব্যাধি, এবং সহানুভূতি, সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসা পেলে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। অর্থাৎ, কখনও কখনও একজন মানুষ খারাপ উদ্দেশ্যে নয়, বরং একটি অদৃশ্য মানসিক তাড়নার কারণেই চুরি করে বসেন, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
