কুড়িগ্রামের উলিপুরে শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক আত্মহত্যা: বেকারত্বের যন্ত্রণায় চিরকুট লিখে বিদায়
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় এক তরুণ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটেছে। আবু কালাম নামের এই যুবক বেকারত্বের গ্লানি ও দারিদ্র্যের বোঝা বহন করতে না পেরে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মনাশের পথ বেছে নিয়েছেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে উলিপুর উপজেলার গনকপাড়া স্লুইসগেট এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। আবু কালাম (১৯) নামের ওই শিক্ষার্থী নিজ কক্ষের আড়ার সঙ্গে রশিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পূর্বে তিনি একটি চিরকুট লিখে যান, যেখানে নিজের বেকারত্বের যন্ত্রণা ও পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কথা উল্লেখ করেন।
নিহত শিক্ষার্থীর পরিচয়
আবু কালাম উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নের গনকপাড়া এলাকার গোলজার আলীর ছেলে। তিনি স্থানীয় এমএ মতিন কারিগরি ও কৃষি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় কালাম প্রায়ই আর্থিক সংকট ও অস্বচ্ছলতার কথা স্বজনদের কাছে প্রকাশ করতেন।
নিহত আবু কালাম দুই ভাইবোনের মধ্যে বড় ছিলেন। তার পিতা ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন বলে জানা গেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পিতার উপার্জনে সংসার চললেও কালাম নিজের বেকারত্বকে মেনে নিতে পারছিলেন না।
চিরকুটে কী লিখেছিলেন কালাম?
আত্মহত্যার পূর্বে রেখে যাওয়া চিরকুটে আবু কালাম মর্মস্পর্শী বার্তা লিখে গেছেন। তিনি লিখেন, 'প্রিয় পরিবার, আমি অনেক ভাগ্যবান যে তোমাদের মতো পরিবার আমি পেয়েছি। কিন্তু আমার মনে হয়, আমার মতো ছেলে পেয়ে তোমরা একটুও সুখী না। কারণ আমি বেকার। সারাজীবন শুধু তোমাদের খেয়ে গিয়েছি, কখনো তোমাদেরকে খাওয়াইতে পারি নাই। তোমরা সবাই আমাকে মাফ করে দিও। আমার জন্য দোয়া করিও। আর আমি দোয়া করি, আমার মতো ছেলে যেন কোনো পরিবারে জন্ম না নেয়।'
আত্মহত্যা আবিষ্কারের মুহূর্ত
নিহতের মা কাজলী বেগম (৪০) জানান, সেহেরির রান্নার জন্য কালামের কক্ষে রাখা চাল নিতে গিয়ে তাকে ডাকাডাকি করেছিলেন। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ছেলেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। তার চিৎকারে পরিবারের অন্য সদস্যরা এগিয়ে এসে ঘটনা দেখে স্থানীয় থানা পুলিশকে খবর দেন।
পুলিশের তদন্ত ও ব্যবস্থা
উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাঈদ ইবনে সিদ্দিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠিয়েছে। এ সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও আত্মহত্যার চিরকুটটি জব্দ করা হয়েছে।
দলদলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য শাহজালাল মিয়াও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, কালাম একজন মেধাবী ও ভবিষ্যৎপ্রত্যাশী তরুণ ছিলেন, কিন্তু অর্থনৈতিক দুরবস্থা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
সমাজের জন্য চিন্তার বিষয়
এই ঘটনা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক চাপের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে গভীর চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাব যুবসমাজের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। আবু কালামের মর্মান্তিক আত্মহত্যা সমাজের সকল স্তরে এই ইস্যুতে সচেতনতা ও পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
