ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য ‘ছাত্র-নির্দেশনা ও পরামর্শদান দফতর’ চালু থাকলেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই এই সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যারা এই কেন্দ্রটি সম্পর্কে অবগত, তাদের একটি বড় অংশই কখনও সেখানে সেবা নিতে যাননি।
শিক্ষার্থীদের মতামত
সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আরমান হোসেন বলেন, “আমার কাছে এই সেবা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনও ইতিবাচক পর্যালোচনা (রিভিউ) আসেনি, যার ওপর ভিত্তি করে আমি সেবা নিতে যেতে পারি।”
একই ধরণের সংশয় প্রকাশ করেছেন জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থী সৌভিক রোহিত। তিনি বলেন, “আমি এই কাউন্সেলিং সেন্টার সম্পর্কে জানি, কিন্তু কারও কাছ থেকেই ইতিবাচক সাড়া পাইনি। বরং আমার মনে হয়েছে, সেখানে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে, তাই কখনোই যাওয়া হয়নি।”
সুফিয়া কামাল হলের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জেনিন জামান তিথী জানান, তিনি কেন্দ্রটি সম্পর্কে কেবল শুনেছেন, তবে বিস্তারিত কোনও তথ্য তার জানা নেই। অপরদিকে, থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান তাহিন নিজে সেবা না নিলেও কয়েকজনকে সেখানে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, যারা জানতেন না, তথ্যটি শোনার পর তারা ইতিবাচক আগ্রহ দেখিয়েছেন।
উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা
আঁচল ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৩১০। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আত্মহত্যা করা ৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪ জনই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের, যা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলেছে। এছাড়া ১৭ জন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের, মেডিক্যাল কলেজের ৬ জন ও ১০ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী।
প্রচারে ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতার কথা জানালেন পরিচালক
ছাত্র-নির্দেশনা ও পরামর্শদান দফতরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. মেহজাবীন হক স্বীকার করেন যে, প্রচারের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। টিএসসিতে অবস্থিত এই কেন্দ্রে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের জন্য বিনামূল্যে এবং কলাভবনে নির্ধারিত ফির বিনিময়ে সেবা দেওয়া হয়।
তিনি জানান, প্রথম বর্ষের ওরিয়েন্টেশনে শিক্ষার্থীদের পরিচিতি পুস্তিকা দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন বিভাগে নিয়মিত কর্মশালা আয়োজনের প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবে তিনি স্বীকার করে বলেন, “অনেকেরই অন্য অনেক কিছুতে আগ্রহ এত বেশি থাকে যে— এই কথাগুলো পাশ দিয়ে বলে গেলেও শোনে না বা চোখে পড়ে না।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি জানান, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি বিশেষ ওয়েবসাইট তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ‘পিয়ার গ্রুপ’ (সহপাঠী দল) গঠনের কাজ চলছে। তিনি বলেন, “বন্ধুরাই সবার আগে বুঝতে পারে। তাই তাদের ছোট্ট একটা ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করতে পারলে, ওরাই বন্ধুকে নিয়ে আসবে সেবা গ্রহণের জন্য।” তবে বাজেট সংকটের কারণে এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মানসম্পন্ন কাউন্সেলিং ও পেশাদারত্বের অভাব
বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. রেজাউল করিম কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি দেশে এই খাতের গুণগত মান নিশ্চিত না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বিদেশের মতো আমাদের দেশে কাউন্সেলিংয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা নৈতিক মানদণ্ড (এথিক্স) এখনও গড়ে ওঠেনি।” পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই অনেকে এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন এবং দেশে কাউন্সেলিংয়ের জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ বা আইন নেই বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।



