মন খারাপ নয়, অ্যানহেদোনিয়া: সুখ হারানোর গভীর উপসর্গ
মন খারাপ নয়, অ্যানহেদোনিয়া: সুখ হারানোর গভীর উপসর্গ

দৈনন্দিন জীবনে কোনো কিছুতেই আনন্দ কিংবা উৎসাহ খুঁজে না পাওয়ার অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘অ্যানহেদোনিয়া’। এটি স্রেফ মন খারাপ নয়, বরং মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনের একটি অন্যতম প্রধান ও গভীর উপসর্গ। এ অবস্থায় একসময় যে কাজগুলো করতে ভালো লাগত, এখন সেখান থেকেও কোনো আনন্দ পাওয়া যায় না। মন খারাপ হয়। আর মন খারাপ মানেই অবসাদ নয়। অবসাদকে যদি বিরাট এক ছাতা বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে এর এক টুকরো জায়গা দখল করে থাকবে সেই ভালো না লাগার অনুভূতি।

অ্যানহেদোনিয়া কী?

অ্যানহেদোনিয়ার সহজ অর্থ হচ্ছে— আনন্দ অনুভব করার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। এটি মূলত মস্তিষ্কের 'ডোপামিন' নামক রাসায়নিকের প্রবাহে বা 'রিওয়ার্ড সিস্টেমে' ব্যাঘাত ঘটার কারণে হয়ে থাকে। মস্তিষ্ক তখন বুঝতে কিংবা সিগন্যাল দিতে পারে না যে, আপনি কোনো কিছুতে সুখী হচ্ছেন।

ভালো না লাগার কারণ

এ জীবনে কিছু ভালো না লাগার কারণ অবসাদ ঠিক নয়। ঘুম থেকে উঠতে ভালো লাগছে না, ভালো-মন্দ খেতে ভালো লাগছে না, ঘুরতে যেতে ভালো লাগছে না— এমনকি কাছের মানুষকেও ঠিক ভালো লাগছে না। সর্বোপরি ভালো না লাগার যে অনুভূতি, তাকে ‘ডিপ্রেশন’ ভেবে ফেললে ভুল হবে। এও মনের এক জটিল অবস্থা। ইতিবাচক ভাবনাগুলোর ওপরে চেপে বসে নেতিবাচক চিন্তা। আর তাতেই মন খারাপের মেঘ ঘনায়। একদিনে তা হয় না; হয় ধীরে ধীরে। তিলে তিলে এর বীজ রোপিত হয় মনের অন্তরালে। একদিন তারাই ডালপালা মেলে চরম উৎকণ্ঠা ও অবসাদের কারণ হয়ে ওঠে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মন খারাপ বনাম অবসাদ

মনখারাপ মানেই অবসাদ নয়; অবসাদকে যদি বিরাট এক ছাতা বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে এর এক টুকরো জায়গা দখল করে থাকবে সেই ভালো না লাগার অনুভূতি। মনোবিজ্ঞানের জগতে মনের এ অবস্থাকে বলা হয় ‘অ্যানহেদোনিয়া’। কখনো তা অবসাদের চেয়েও মারাত্মক হয়ে ওঠে। জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে দেয়। নিংড়ে নেয় সবটুকু সুখ। সংসার, কর্মজীবন, সম্পর্কের ঘেরাটোপে থেকে উদ্বেগ আসাটা খুবই স্বাভাবিক। দুশ্চিন্তার মেঘ কখন যে মনের স্বতঃস্ফূর্ততাকে ভেঙে তছনছ করে দেয়, তা টের পাওয়া যায় না। জীবনের প্রতিটি ছোট ছোট মুহূর্তকে গভীরভাবে বোঝা, জানা বা দেখার ইচ্ছাটাই চলে যায়। তখন খারাপ চিন্তাগুলোই দখল করে নেয় মনের সিংহভাগ জায়গা। ‘অ্যানহেদোনিয়া’ তেমনই।

সবার জীবনে আসে

প্রায় সবাই এমন মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছেন কখনো না কখনো। তা হঠাৎ করে আসা শোক হোক, দুর্ঘটনার কারণে প্রাপ্ত গভীর বিষাদ হোক কিংবা আচমকাই ঘনিয়ে ওঠা মনখারাপ হোক। কারণ যা-ই হোক না কেন, তার ফল একটাই— সুখ হারিয়ে ফেলা। পছন্দের জিনিসও অপছন্দের কারণ হয়ে ওঠা। অথবা কোনো কিছুতেই ভালো না লাগা। হতাশা, বিষাদ ও ক্লান্তি ধীরে ধীরে গ্রাস করে মনোজগতকে। কারও ক্ষেত্রে তা সাময়িক, আবার কারও ক্ষেত্রে তা-ই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে অবসাদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আনন্দ হারিয়ে ফেলার অনুভূতি

অ্যানহেদোনিয়াকে সহজ-সরলভাবে ব্যক্ত করতে হলে বলতে হবে— আনন্দ পেতে ভুলে যাওয়া। তার মানে দুঃখবিলাস নয়; শুধু আনন্দের অনুভূতিটা হারিয়ে যাওয়া। এ বিষয়ে মনোরোগ চিকিৎসক কেদাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আনন্দ, উল্লাস বা তৃপ্তি অনুভব করার অক্ষমতাই হলো অ্যানহেদোনিয়া। এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে খুশির বা পছন্দের মুহূর্তগুলোতেও নেতিবাচক চিন্তা করতে থাকেন। হয়তো কেউ বহুদিনের চেষ্টার পর চাকরি পেয়েছেন, তারপরও আনন্দ পেলেন না। অথবা পছন্দের জায়গায় ঘুরতে গিয়েও হতাশায় ভুগছেন। প্রিয় মানুষটিকে আর ভালোই লাগছে না। কৌতুকের কথা শুনেও বিরক্ত হচ্ছেন। মন সম্পূর্ণ উদাসীন ও অনুভূতিহীন হয়ে পড়ার অবস্থাই হলো অ্যানহেদোনিয়া।

চিকিৎসা: ইতিবাচক চিন্তাই মূল

অ্যানহেদোনিয়ার দাওয়াই কোনো ওষুধ নয়; বরং ইতিবাচক চিন্তা দিয়েই এর মোকাবিলা করা সম্ভব। গবেষকরা এক নতুন রকম চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলেছেন, যার নাম ‘পজিটিভ এফেক্ট ট্রিটমেন্ট’। অর্থাৎ খারাপ চিন্তাগুলোকে দূর করার চেষ্টা না করে বরং ইতিবাচক চিন্তাশক্তিকে বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করা। বিষাদে মন কতটা ভারি, তা লাঘব করার চেষ্টা এখানে হবে না। বরং ভারাক্রান্ত মনকেই হাশিখুশি করে তোলার প্রয়াস হবে এ চিকিৎসায়।

মনোবিদের পরামর্শ

মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায় বলেন, ভালোমন্দ, হাসিকান্না, ওঠাপড়া নিয়েই জীবন। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগও সেই জীবনের অঙ্গ। অনুভূতিরও ভালো বা খারাপ আছে। তাই অতীতে যদি কোনো খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় কিংবা বর্তমানে মানসিক দিক থেকে কোনো আঘাত আসে, তা কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হবে না। খারাপ অনুভূতি থেকে জোর করে পালানোর চেষ্টা না করে জীবনে যা আসছে, আসতে দিন। দুঃখের স্মৃতি এলেও তাকে ইতিবাচক ভাবনা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। হলেই ভালো অনুভূতি নতুন করে তৈরি হবে। খারাপ স্মৃতিগুলো ফিকে হয়ে আসবে। সবসময়ে মনে রাখতে হবে একটাই আপ্তবাক্য— জীবন আসলে একটি বহতা নদীর মতো। সেখানে ভালো-খারাপ, কোনোটাই স্থায়ী নয়। আজ যদি খারাপ সময় যায়, সে চলে যাবে। ঠিক তেমনই ভালো সময়ও বরাবর টিকবে না। তাই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ না করে জীবনের ছোট ছোট আনন্দে ভেসে যাওয়াই অ্যানহেদোনিয়া থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হতে পারে।