অটিজম ও এডিএইচডি নির্ণয়ে সতর্কতা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন গভীর মূল্যায়ন জরুরি
অটিজম ও এডিএইচডি নির্ণয়ে সতর্কতা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন গভীর মূল্যায়ন জরুরি

আজকাল প্রায়ই শোনা যায়—অমুকের সন্তান কথা শুনছে না, হয়তো সে এডিএইচডিতে আক্রান্ত। আবার কোনও শিশু একটু চুপচাপ হলেই অনেকে ধরে নেন, সে অটিজম স্পেকট্রামে আছে। সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে গভীর ও নির্ভুল মূল্যায়নের আগেই কেবল কিছু আচরণগত বৈশিষ্ট্য দেখে শিশুদের মানসিক বা স্নায়বিক সমস্যার তালিকায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মনির্ণয়ের প্রবণতাও বেড়েছে। ফলে অটিজম ও এডিএইচডি নিয়ে বিভ্রান্তি, অতিরঞ্জন এবং বিতর্কও বাড়ছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—আসল বৈজ্ঞানিক অবস্থান কী?

অটিজম স্পেকট্রাম নিয়ে বিতর্ক

অটিজম গবেষক উইটা ফ্রিথ দীর্ঘদিন ধরে অটিজমের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে কাজ করছেন। অটিজমের বর্তমান ‘স্পেকট্রাম’ ধারণা নিয়ে গবেষকদের মধ্যেও বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, নির্ণয়ের পরিধি বিস্তৃত হওয়ায় আগের তুলনায় এখন আরও বেশি মানুষ শনাক্ত হচ্ছেন। এই বিতর্কে কয়েকটি বিষয় প্রায়ই সামনে আসে:

  • সংজ্ঞার বিস্তৃতি: নব্বইয়ের দশকের পর অটিজম নির্ণয়ের মানদণ্ড বিস্তৃত হওয়ায় শনাক্তের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
  • তীব্রতার ভিন্নতা: মৃদু সামাজিক যোগাযোগগত সমস্যা থেকে শুরু করে গভীর সহায়তানির্ভর অবস্থাও একই স্পেকট্রামের মধ্যে পড়ছে।
  • ব্যক্তিত্ব বনাম প্যাথলজি: কিছু গবেষক মনে করেন, মানুষের স্বাভাবিক আচরণগত বৈচিত্র্যের একটি অংশকেও কখনও কখনও রোগের কাঠামোয় ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
  • চিকিৎসা ও মূল্যায়ন: বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, দ্রুত সিদ্ধান্তের বদলে দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর মূল্যায়ন জরুরি।

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা একইসঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, অটিজম ও এডিএইচডি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিউরোডেভেলপমেন্টাল অবস্থা, এবং সঠিক মূল্যায়ন ও সহায়তা অনেক শিশুর জীবনমান উন্নত করতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট’ ও ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকি

মানব মস্তিষ্কের একটি পরিচিত মনস্তাত্ত্বিক ধারণা হলো ‘ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট’। এতে সীমিত জ্ঞানসম্পন্ন কেউ নিজের বোঝাপড়াকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করতে পারেন। কখনও কখনও কোনও শিশুর গভীর কৌতূহল, প্রচলিত নিয়মের বাইরে চিন্তা করার প্রবণতা বা ব্যতিক্রমী আচরণকে ভুলভাবে ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়। এতে প্রতিভাবান বা সৃজনশীল শিশুরাও অপ্রয়োজনীয়ভাবে ‘অস্বাভাবিক’ তকমার মুখে পড়তে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, একইসঙ্গে প্রকৃত নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যাকে অবহেলা করাও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ অনেক শিশু সময়মতো সহায়তা না পেলে শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক বিকাশে পিছিয়ে পড়তে পারে।

‘মেটামরালিটি’: ভিন্নতাকে দেখার অন্য দৃষ্টিভঙ্গি

সমাজ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে মানুষকে বিচার করে। যে শিশু অন্যদের মতো আচরণ করে না, তাকে প্রায়ই ‘সমস্যাযুক্ত’ হিসেবে দেখা হয়। কোনও শিশুকে কেবল সামাজিক ছাঁচে না মেলার কারণে দ্রুত রোগী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

আমাদের করণীয়

শিশুর আচরণগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং পরিবার-স্কুলের সমন্বিত বোঝাপড়া জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন সচেতনতা—যাতে একদিকে প্রকৃত সমস্যাকে অস্বীকার না করা হয়, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় ‘লেবেলিং’-ও না ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সহানুভূতি, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, পারিবারিক সমর্থন এবং ব্যক্তিভেদে উপযুক্ত সহায়তাই শিশুদের সুস্থ বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।