সাভারের তেঁতুলঝোড়ায় ভাষাশহীদ রফিক সেতুসংলগ্ন এলাকায় থাকেন আল আমিন। এই সেতুর অদূরে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে ফেলা হচ্ছে নানা বর্জ্য। এতে এ এলাকা দিয়ে চলাচলকারী আল আমিনের মতো অনেকেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আল আমিন বলেন, পিকআপে, ময়লার ভ্যানে করে ময়লা এনে এখানে ফেলা হয়। বাতাস এলে গন্ধ ছড়ায়। তাঁরা ভোগান্তিতে পড়েন।
আমিনবাজার ও বলিয়ারপুরে বর্জ্যের স্তূপ
সাভারের আমিনবাজার এলাকায় থাকেন মাহমুদুল হাসান। চাকরি করেন ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে। বন্ধের দিন ছাড়া প্রতিদিনই হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজারের ময়লার ভাগাড়ের অংশের পাশ দিয়ে তাঁকে যেতে হয়। মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, গরমে ময়লা থেকে ধুলা উড়ে আসে আর বৃষ্টি হলে ময়লার দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। এতে সর্দি–কাশি লেগেই থাকে।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, মহাসড়কের উভয় পাশে অন্তত ১২টি স্থানে ময়লা ফেলা হচ্ছে। আমিনবাজার এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ময়লার ভাগাড় রয়েছে। পাশেই বলিয়ারপুর পৌরসভার জন্য নির্ধারিত স্থানে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। আমিনবাজার থেকে বলিয়ারপুরে বর্জ্যের দূষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সাভার পৌরসভায় প্রতিদিন ৩১০ টন বর্জ্য
সাভার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, শুধু পৌরসভা এলাকায় ২০-৩০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। শিল্পকারখানা ও মানুষের বসবাসের কারণে পৌর এলাকায় প্রতিদিন ৩১০ টনের মতো বর্জ্য উৎপাদন হয়। ৯টি ওয়ার্ডের জন্য ৮৯টি ভ্যান দিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণে ৩০০ জন কাজ করেন।
সাভার পৌরসভার প্রশাসক ও ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্জ্য অপসারণে যে পরিমাণ লজিস্টিক সাপোর্ট ও পরিবহনসুবিধা থাকা প্রয়োজন, তা নেই। বলিয়ারপুরে যেখানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, সেখানে হয়তো দেড়-দুই বছর বর্জ্য ফেলা যাবে। পরে নতুন ডাম্পিং ইয়ার্ডের প্রয়োজন হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পৌরসভার বার্ষিক বাজেট ৩৫ কোটি টাকা। এটি সাভার পৌরসভার রাজস্ব বাজেট। এ বাজেটের প্রায় সব অংশই খরচ হয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়।’
গাজীপুরে প্রতিদিন ৪০০০ টন বর্জ্য, নেই স্থায়ী ল্যান্ডফিল
গাজীপুর নগরীতে ৩০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। ছোট-বড় মিলিয়ে শিল্পকারখানা আছে প্রায় ৫ হাজার। অথচ এত লোকের, এত কলকারখানার বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে চার হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। এর একটি বড় অংশ সিটি করপোরেশন সংগ্রহ করলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে সেই বর্জ্যের একটি অংশ নির্দিষ্ট স্থানে না গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে শহরের বিভিন্ন খোলা জায়গা ও সড়কের পাশে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক সোহেল রানা বলেন, ‘গাজীপুরে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার টন বর্জ উৎপন্ন হচ্ছে। আমরা নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করছি, কিন্তু স্থায়ী ও আধুনিক ল্যান্ডফিল সুবিধা না থাকায় পুরো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা যাচ্ছে না। জমিসংকটও বড় সমস্যা।’
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন রুনু প্রথম আলোকে বলেন, কেমিক্যাল–মিশ্রিত বর্জ্যসহ যেসব বর্জ্য পরিবেশদূষণে দায়ী, সেগুলো যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। সেগুলোর যে লিচেট বা এগুলোর গলিত পানি মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পানিতে চলে যাচ্ছে। বন্যা ও বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে আশপাশের কৃষিজমি, নদীনালায় চলে যাচ্ছে। এতে পানি-মাটি দূষিত হচ্ছে। অনেক সময় এসব বর্জ্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে বাতাস দূষিত হচ্ছে। এসব দূষণ নানাভাবে মানবদেহে গিয়ে শ্বাসজনিত সমস্যা, স্ট্রোক, চর্মরোগ, ক্যানসারসহ নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করছে।
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, উন্মুক্ত স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্যে অনেক ‘ডাস্ট পার্টিকল’ রয়েছে, যা বাতাসে ওড়ে। আমরা আবার তা শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করি। ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ডাম্পিং করতে হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে মারাত্মক দূষণ
২০২২ সালের নভেম্বর মাসে এমডিপিআইয়ের সয়েল সিস্টেম জার্নালে ‘ইমপ্যাক্ট অব ল্যান্ডফিল্ড লেচার অন দ্য সারাউন্ডিং এনভায়রনমেন্ট: এ কেস স্টাডি অন আমিনবাজার ল্যান্ডফিল্ড, ঢাকা (বাংলাদেশ)’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ওই প্রবন্ধে গবেষণার জন্য ল্যান্ডফিল্ডের এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্য থেকে পাঁচ ধরনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, লিচেট উচ্চ মাত্রার দূষণ বহন করছে, যা ভূপৃষ্ঠের পানি, ভূগর্ভস্থ পানি, মাটি এবং উদ্ভিদকে দূষিত করছে।
কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ
গাজীপুর সিটির প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার বলেছেন, নগরকে আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করে গড়তে ইতিমধ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় শহরে ময়লা-আবর্জনার পরিমাণও বেশি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ডাম্পিং স্টেশন ও ময়লার ভাগাড় স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।



