কাশির সময় মাথাব্যথা কী?
সাধারণত কাশির কারণে গলা বা বুকে সাময়িক অস্বস্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবার কাশির সঙ্গে যদি মাথায় তীব্র ঝটকা বা ব্যথা অনুভূত হয়? আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় কাশি, হাঁচি, হাসা বা অতিরিক্ত শারীরিক কসরতের সময় যে মাথাব্যথা হয়, তাকে ‘কফ হেডেক’ বা কফজনিত মাথাব্যথা বলা হয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই মাথাব্যথা সাময়িক এবং ক্ষতিকারক নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কখনো কখনো এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার পূর্বলক্ষণ হতে পারে। ভারতের বসন্ত কুঞ্জের ফোর্টিস হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের পরিচালক ড. মনোজ শর্মা জানান, কাশি দিলে যদি নিয়মিত মাথাব্যথা হয়, তবে তা কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়—বিশেষ করে ব্যথা তীব্র হলে কিংবা সঙ্গে অন্যান্য উপসর্গ থাকলে।
কফজনিত মাথাব্যথা আসলে কী?
কাশি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা মাথার ভেতরের চাপ বাড়িয়ে দেয় এমন কোনো কাজ (যেমন: হাঁচি দেওয়া, উচ্চস্বরে হাসা, সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া বা মলত্যাগের সময় চাপ দেওয়া) করার ঠিক পরপরই যে মাথাব্যথা শুরু হয়, তাকে কফ হেডেক বলে। ড. শর্মা ব্যাখ্যা করেন, ‘কফজনিত মাথাব্যথা মূলত দুই প্রকার। প্রথমটি হলো প্রাইমারি কফ হেডেক, যা সাধারণত ক্ষতিকারক নয়। কাশি বা অতিরিক্ত চাপের কারণে মাথার খুলির ভেতরে হঠাৎ রক্ত ও তরলের চাপ বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যথা হয়। এটি মাত্র কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।’ এই ব্যথা অত্যন্ত তীব্র বা হঠাৎ ফেটে পড়ার মতো অনুভূতি তৈরি করলেও, সাধারণত এর পেছনে কোনো গুরুতর রোগ থাকে না।
ব্যথার পেছনের মূল কারণ
যখন কোনো ব্যক্তি জোরে কাশি দেন, তখন বুক এবং পেটের ভেতরের চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই আকস্মিক চাপ মাথার খুলির ভেতরের রক্তপ্রবাহ এবং তরল গতিবিদ্যার ওপর সাময়িক প্রভাব ফেলে। এর ফলেই হঠাৎ করে মাথায় তীব্র, ধারালো বা ছুরিকাঘাতের মতো ব্যথা অনুভূত হয়। আশার কথা হলো, এই ব্যথা কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজে থেকে সেরে যায় এবং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
কখন এটি গুরুতর রূপ নিতে পারে?
সব কাশির মাথাব্যথাই কিন্তু নিরীহ নয়। চিকিৎসকরা প্রাইমারি মাথাব্যথার পাশাপাশি সেকেন্ডারি কফ হেডেক-কে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেন, যা শরীরের অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট রোগের কারণে ঘটে থাকে। ড. শর্মা বলেন, ‘সেকেন্ডারি কফ হেডেকের পেছনে মস্তিষ্ক বা এর চারপাশের কাঠামোগত সমস্যা দায়ী থাকতে পারে। যেমন—সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (মস্তিষ্কের তরল) প্রবাহে বাধা, মস্তিষ্কের গঠনে কোনো ত্রুটি কিংবা বিরল ক্ষেত্রে ব্রেন টিউমার।’ এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে কাশি মূলত মূল রোগটিকে সামনে নিয়ে আসার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, কাশি নিজে ব্যথার মূল কারণ নয়।
যেসব উপসর্গ দেখলে অবিলম্বে সতর্ক হবেন
সেকেন্ডারি কফ হেডেক সাধারণত প্রাইমারি হেডেকের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র হয় এবং দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে। এর সঙ্গে কিছু স্নায়বিক বা নিউরোলজিক্যাল উপসর্গ দেখা দেয়, যা বিপদের লক্ষণ:
- মাথা ঘোরানো
- হাঁটতে সমস্যা হওয়া বা শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারা
- দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া বা দ্বৈত দৃষ্টি
- হাত বা পায়ে দুর্বলতা অনুভব করা
- শরীরে অবশ ভাব বা সুই ফোটার মতো অনুভূতি
- অনবরত বমি হওয়া
- মানসিক বিভ্রান্তি বা হ্যালুসিনেশন
- হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
উপরের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
কাশি দেওয়ার পর মাঝেমধ্যে হালকা মাথাব্যথা হওয়া উদ্বেগের কারণ না হলেও ড. শর্মার মতে নিচের পরিস্থিতিগুলোতে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:
- জীবনে প্রথমবার কাশির সঙ্গে এমন মাথাব্যথা হলে।
- ব্যথা যদি অত্যন্ত তীব্র হয় এবং দিন দিন বাড়তে থাকে।
- মাথাব্যথা যদি কয়েক মিনিটের চেয়ে বেশি সময় স্থায়ী হয়।
- ব্যথার সঙ্গে যদি জ্বর থাকে।
- বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে।
- চোখের দৃষ্টিতে সমস্যা দেখা দিলে।
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য ইতিহাস এবং লক্ষণগুলো পর্যালোচনা করবেন। কোনো সন্দেহজনক লক্ষণ পাওয়া গেলে ড. শর্মার ভাষ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কের কোনো কাঠামোগত ত্রুটি বা তরল প্রবাহের সমস্যা আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে এমআরআই বা সিটি স্ক্যান করার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসা
প্রাইমারি কফ হেডেকের ক্ষেত্রে: লক্ষণ ও ব্যথার তীব্রতা কমানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। অনেক সময় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়।
সেকেন্ডারি কফ হেডেকের ক্ষেত্রে: এর চিকিৎসা পুরোপুরি নির্ভর করে মূল রোগটি কী, তার ওপর। রোগ নির্ণয়ের পর ওষুধ, বিশেষায়িত নিউরোলজিক্যাল কেয়ার কিংবা প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের শেষ পরামর্শ
কাশি দিলেই মাথায় ব্যথা হওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বিশেষ করে এটি যদি নতুন শুরু হয় এবং তীব্র হয়, তবে ঘরে বসে নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার মাধ্যমে সম্ভাব্য বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব এবং এতে মানসিক স্বস্তিও ফেরে।
সূত্র: এনডিটিভি



