এক কাপ খাঁটি দুধে প্রায় ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি, হাড় শক্ত ও সুস্থ রাখতে প্রতিদিন দুধ খেতে হবে। বিজ্ঞাপনেও এই ধারণা প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।
দুধের পেছনের বিজ্ঞাপনী সত্য
হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও পুষ্টিবিজ্ঞানী ওয়াল্টার উইলেট জানান, প্রতিদিন দুধ খাওয়ার এই কথাটি খুব অল্প সময়ের কিছু গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। এই প্রচারণাকে জনপ্রিয় করতে বড় ভূমিকা ছিল দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে দুধের ওপর হওয়া গবেষণাগুলোর এক তৃতীয়াংশেরই অর্থায়ন করেছিল দুগ্ধ শিল্পের কোম্পানিগুলো।
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা ও বিকল্প
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানী ও মেডিসিনের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার গার্ডনার জানান, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এক তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা রয়েছে। অর্থাৎ তাদের শরীর গরুর দুধ সহ্য করতে পারে না। তাই পুষ্টির জন্য সবার গরুর দুধ পান করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে হাড় ও শরীরের সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাদের ক্যালসিয়ামের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি, তাদের দুধ নিয়মিত খাওয়া প্রয়োজন। তবে ক্যালসিয়ামের জন্য শুধু গরুর দুধের ওপর নির্ভর না করে টোফু, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি, ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কমলার রস ও বাদামের দুধ থেকেও ভালো পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
হাড়ের সুরক্ষায় দুধের প্রকৃত ভূমিকা
আমাদের শরীর, হাড় ও দাঁত সুস্থ রাখতে ক্যালসিয়াম অত্যন্ত জরুরি। তবে দৈনিক কতটুকু ক্যালসিয়াম প্রয়োজন তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশিকায় প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়ামের কথা বলা হলেও যুক্তরাজ্যে পরামর্শ দেওয়া হয় মাত্র ৭০০ মিলিগ্রাম।
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট বা দুধ খেলে হাড়ের ঘনত্ব মাত্র ৩ শতাংশ বাড়ে, যা হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে তেমন ভূমিকা রাখে না। ২০২০ সালের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্বের যেসব দেশে মানুষ সবচেয়ে কম দুধ খায়, সেখানে হাড় ভাঙার হারও সবচেয়ে কম। বেশি দুধ পানের সঙ্গে হাড় ভালো থাকার সরাসরি কোনো প্রমাণ মেলেনি।
কার বেশি দুধ বা ক্যালসিয়াম প্রয়োজন?
৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী বাড়ন্ত শিশু-কিশোর এবং ৫০ ঊর্ধ্ব প্রবীণদের হাড়ের সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে তরুণ বয়সে শরীর খাবার থেকে বেশি পুষ্টি নেয়, কিন্তু বয়স বাড়লে এই ক্ষমতা কমে যায়। তখন শরীর হাড় থেকে ক্যালসিয়াম টানা শুরু করে, ফলে হাড় দুর্বল ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
অস্ট্রেলিয়ায় ৭ হাজার বয়স্ক মানুষের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন তিন বেলা দুগ্ধজাত খাবার খেয়েছেন, তাদের হাড় ভাঙার ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ১১ শতাংশ কমে গেছে। এদের হাড় ও পেশীর গঠনও অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো ছিল।
দুধের বিকল্প ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
দুধে প্রোটিন ও পটাশিয়াম সহজে পাওয়া গেলেও এটি একমাত্র উৎস নয়। দুধের বাইরেও টোফু, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি, ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কমলার রস ও বাদামের দুধ থেকে ভালো পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। দুধের চেয়েও সেরা বিকল্প হলো দই বা পনিরের মতো খাবার। এগুলো পেটের জন্য উপকারী, ল্যাকটোজের সমস্যা থাকলেও সহজে হজম হয় এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে দুধের চেয়ে বেশি কার্যকর। মাত্র দেড় আউন্স চেডার চিজ থেকেই এক কাপ দুধের সমান ক্যালসিয়াম পাওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, দুধ ভালো লাগলে অবশ্যই খাবেন। আর পছন্দ না হলে বা শরীরে না সইলে নির্দ্বিধায় অন্য বিকল্প খাবার বেছে নেবেন।



