বাংলাদেশে বছরে প্রায় সাড়ে ৬ থেকে ৭ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। অথচ রক্তের অভাবে অনেক মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা শুরু করা যায় না। কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত রোগীর ডায়ালাইসিসের পরও রক্তের অভাবে দুশ্চিন্তায় ভোগেন পরিবার। অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করে অপেক্ষা করতে থাকেন এক ব্যাগ রক্তের জন্য। যখনই খবর পান রক্ত পাওয়া গেছে, তখন প্রাণ ভরে দোয়া করেন। স্বেচ্ছা রক্তদাতারা হলেন মানুষের জীবন বাঁচানোর আন্দোলনের দূত। ভালো কাজে মানুষ সবসময় অন্যকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়। বন্ধু রক্ত দিচ্ছে দেখে তার আরও বন্ধুও রক্ত দিতে উদ্বুদ্ধ হয়।
রক্তদান একটি মানবিক দায়বদ্ধতা
রক্তদান একটি মানবিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক অঙ্গীকার। যিনি যে পেশায়ই থাকুন না কেন, সমাজের জন্যে তার কিছু না কিছু করার আছে। এক ব্যাগ রক্তদানের মাধ্যমেও তিনি পালন করতে পারেন তার সামাজিক অঙ্গীকার। একবার অন্তত ভাবুন, আপনার রক্তে বেঁচে উঠছে একটি অসহায় শিশু, একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ। সে মুহূর্তে আপনার যে মানসিক তৃপ্তি তাকে কখনোই অন্য কোনোকিছুর সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়। রক্তদান স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। রক্তদান করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরের মধ্যে অবস্থিত ‘বোন ম্যারো’ নতুন কণিকা তৈরির জন্যে উদ্দীপ্ত হয়। দান করার ২ সপ্তাহের মধ্যেই নতুন রক্ত কণিকা জন্ম হয়ে এই ঘাটতি পূরণ করে। আর প্রাকৃতিক নিয়মেই যেহেতু প্রতি ৪ মাস পর পর আমাদের শরীরের রেড সেল বদলায়, তাই বছরে ৩ বার রক্ত দিলে শরীরের লোহিত কণিকাগুলোর প্রাণবন্ততা আরও বেড়ে যায়।
নারীরা কেন পিছিয়ে?
বিগত কয়েক বছরে দেশে স্বেচ্ছা রক্তদাতার সংখ্যা বেশ বেড়েছে। তবে এক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে আছেন অনেকটাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, বাংলাদেশে রক্তদাতাদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ নারী! কিন্তু নারীরা কেন পিছিয়ে? রক্তদানের ক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে থাকার কারণ অনেকাংশেই পরিবার বা নিকটাত্মীয়। ‘মেয়ে মানুষ, সুঁইয়ের খোঁচা সহ্য করতে পারবে তো?’ ‘মেয়েদের শরীরে তো এমনিতেই রক্ত কম!’ ‘রক্ত দিলে চেহারা খারাপ হয়ে যাবে’ ‘এমনিতেই তো হ্যাংলা পাতলা; রক্ত দিলে তো শরীরে কিছুই থাকবে না!’—এমন অজস্র ভুল ধারণা বা ভ্রান্তবিশ্বাস নারীদের মনে ঢুকে যায় কাছের মানুষদের মুখে বারংবার এই নেতিবাচক কথাগুলো শুনতে শুনতে। অথচ সন্তান ধারণ থেকে শুরু করে জন্মদানের মতো দীর্ঘ অবর্ণনীয় কষ্টকর প্রক্রিয়া সহ্য করার স্রষ্টাপ্রদত্ত শক্তি রয়েছে নারীদের। অতএব, একটুখানি প্রেরণা আর উৎসাহ পেলে রক্তদানের মতো এতবড় একটি পুণ্যের কাজেও নারীরা এগিয়ে যাবেন রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের আর দশটা অঙ্গনের মতো।
একজন নারী কখন রক্ত দিতে পারবেন?
রক্তদানের ক্ষেত্রে নারীদের বিশেষ কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। পুরুষ হোক বা নারী, শারীরিকভাবে সুস্থ হলে যে-কেউই চার মাস পর পর রক্ত দিতে পারবেন। ওজন ন্যূনতম ৫০ কেজি, বয়স ১৮ থেকে ৬০-এর মধ্যে, রক্তচাপ স্বাভাবিক এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে ১৪ গ্রাম—নারীদের রক্তদানের যোগ্যতা স্রেফ এগুলোই।
এক ব্যাগ দেয়ার পরেও শরীরে থাকে বাড়তি রক্ত!
অনেকেরই ধারণা, রক্ত দিলে বুঝি শরীরে রক্তের কমতি পড়ে! ধারণাটি ভুল। গড়পড়তা পুরুষদের শরীরে উদ্বৃত্ত রক্তের পরিমাণ ১৩০০ মি.লি. এবং নারীদের ৮০০ মি.লি.। অন্যদিকে, স্বেচ্ছা রক্তদানে একজন দাতার কাছ থেকে নেওয়া হয় মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার রক্ত। তাই এক ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পরও শরীরে থাকে পর্যাপ্ত রক্ত। আর রক্তদানের পরবর্তী কিছুদিন ভিটামিন-সি যুক্ত ফলমূল, সবুজ শাকসবজি, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ খেলে এবং পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রদত্ত রক্তের ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়।
কখন রক্ত দেওয়া যাবে না?
কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে নারীদের রক্তদান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মাসিক চলাকালীন সময়ে রক্ত দেয়া যাবে না। মাসিক শেষ হবার সাত দিন পর নারীরা রক্ত দিতে পারেন। অন্তঃসত্ত্বা কিংবা প্রসূতি, স্তন্যদানকারী মা কিংবা গর্ভপাত হয়ে থাকলে রক্তে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিকের চাইতে কিছুটা কম থাকে। তাই আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রক্তদান থেকে বিরত থাকতে হবে। এছাড়াও কোনো অসুস্থতার কারণে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে ওষুধের কোর্স চলাকালীন সময়ে রক্তদান করা যাবে না। কোর্স শেষ হওয়ার সাত দিন পর থেকে রক্ত দেয়া যাবে।
রক্ত দিলে কী লাভ?
সব কথার পরও প্রাসঙ্গিক কথা হলো—একজন নারী কেন রক্ত দেবেন? দিয়ে তার কী লাভ? আসলে রক্তদান দাতার জন্যেই কল্যাণের। নিয়মিত রক্তদাতাদের ফুসফুস, লিভার, পাকস্থলী, কোলন ক্যান্সারসহ ১৭টিরও বেশি রোগের ঝুঁকি কম থাকে। ওজন নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝোঁক থাকে অনেক নারীরই। তাদের জন্যে সুখবর হলো, নিয়মিত রক্তদান ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে; কমিয়ে দেয় শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমার প্রবণতা। শরীরে ফ্রি রেডিকেল তৈরি হওয়ার কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, নারীদের ক্ষেত্রে যা বেশি দৃশ্যমান। রক্ত দিলে শরীর থেকে ফ্রি রেডিকেলগুলো বের হয়ে যায়, যা সাহায্য করে তারুণ্য ধরে রাখতে। এছাড়াও, নিয়মিত রক্তদানে ত্বক থাকে টানটান ও লাবণ্যময়, দেহমন থাকে প্রাণবন্ত ও এনার্জেটিক। তাই নারী হিসেবে যেখানে অন্যান্য ক্ষেত্রে আপনি এগিয়ে আছেন, রক্তদানের মতো মহৎকাজে কেন পিছিয়ে থাকবেন? আসুন, সাহসী সিদ্ধান্ত নিন; ১৯তম জন্মদিনকে স্মরণীয় ও রহমতে পূর্ণ করুন রক্তদানের মাধ্যমে। প্রকৃতির প্রতিদানেই বরকত ও প্রাপ্তিতে ভরে উঠবে আপনার জীবন।



