টিকাদান কর্মসূচিতে নতুন গতি: সরকারের উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান কর্মসূচি যে কোনো দেশের জন্য অপরিহার্য একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে এটি সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে টিকা সংকট এবং হাম-রুবেলায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কিছু মৌলিক দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ যেমন ইতিবাচক, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইপিআই কর্মসূচির সাফল্য ও বর্তমান সংকট
বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) একসময় জনস্বাস্থ্য খাতের অন্যতম সফল উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এই কর্মসূচির মাধ্যমে পোলিও নির্মূল, ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণ এবং হেপাটাইটিস প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এ সাফল্য প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি পর্যায়ে এই সফল কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। পরিকল্পনার ঘাটতি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং তদারকির অভাব ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে, যার প্রতিফলন আজকের সংকটে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
হাম-রুবেলায় শিশুমৃত্যু: একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
সাম্প্রতিক সময়ের টিকা সংকট এবং হাম-রুবেলায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আক্রান্তদের বড় অংশই ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, যা বিশেষভাবে চিন্তার বিষয়। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও তার প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে। প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুবরণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়; এটি কেবল স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই নয়, বরং নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
সংকটের পেছনের কাঠামোগত সমস্যা
এই সংকটের পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা কাজ করেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে টিকার মজুত কমে যাওয়া, সময়মতো নতুন টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা, মাঠপর্যায়ে সরবরাহে বিঘ্ন এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব—সব মিলিয়ে একটি সমন্বয়হীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও টিকা নেই, কোথাও জনবল সংকট—এ ধরনের চিত্র একটি সুসংগঠিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল পরিকল্পনার ফল বলেই প্রতীয়মান হয়।
সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ ও ইতিবাচক পদক্ষেপ
তবে ইতিবাচক দিক হলো, সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যেখানে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা পূর্বে টিকা নিয়েছে কি না, তা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না—যা একটি বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত। সংক্রমণপ্রবণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে, যা একটি লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। টিকাদান কার্যক্রম তদারকিতে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কার্যক্রমের গুরুত্ব ও কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায় যে সরকার পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে এবং তা মোকাবিলায় আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে নজর
তবে শুধু তাৎক্ষণিক উদ্যোগ গ্রহণ করলেই চলবে না; এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। টিকার ঘাটতি কেন তৈরি হলো, কেন সময়মতো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি এবং কেন সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।
জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অবহেলার মূল্য অনেক বড়। প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। তাই এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্যখাতের ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একটি কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশ
দীর্ঘমেয়াদে টিকাদান কর্মসূচিকে সফল রাখতে হলে শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সময়মতো টিকা সংগ্রহ, পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা এবং দ্রুত বিতরণের জন্য আধুনিক কোল্ড চেইন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করাও প্রয়োজন। কার্যকর তদারকি ও সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের সংকট অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের চিহ্নিত করে তাদের আওতায় আনা জরুরি। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা নিতে পারেনি, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই “ড্রপআউট” সমস্যা সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের বর্তমান উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। তবে এটিকে টেকসই ও কার্যকর করতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই কেবল একটি শক্তিশালী, কার্যকর এবং নির্ভরযোগ্য টিকাদান ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



