মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় ধোঁয়ার কার্যকারিতা: গবেষণা ও প্রাকৃতিক সমাধান
মশা উপদ্রব ও ধোঁয়ার কার্যকারিতা: গবেষণা বিশ্লেষণ

মশার ভয়াবহ উপদ্রব: ঢাকায় সংখ্যা বেড়েছে ৪০%

বর্তমানে মশার অত্যাচারে ঘরের বাইরে শান্তিতে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের একটি গবেষণা চালানো হয়েছে, যা মশার এই ভয়ংকর পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, মাত্র এক মাসের ব্যবধানেই জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় মশার সংখ্যা বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি।

কিউলেক্স মশার আধিপত্য ও উদ্বেগজনক তথ্য

সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, ঢাকার এই মশার ৯০ শতাংশই হচ্ছে কিউলেক্স মশা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে: ঢাকার কিছু এলাকায় এখন এক ঘণ্টায় গড়ে ৮৫০টি পর্যন্ত মশা কামড়াতে আসে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চলতি মাসে মশার এই উপদ্রব আরও কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।

ধোঁয়ার মাধ্যমে মশা তাড়ানোর ঐতিহ্য ও আধুনিক গবেষণা

মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ এখন মশা মারার ব্যাট, কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করেও আর শান্তি পাচ্ছে না। যখন কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না, তখন অনেকেই পুরোনো আমলের সেই প্রাকৃতিক উপায় অর্থাৎ ধোঁয়া ব্যবহার করছেন। আমরা দেখি, সিটি করপোরেশন থেকে মশা মারার জন্য বড় ফগিং মেশিন দিয়ে ধোঁয়া দেওয়া হয়। আবার অনেকে বাসাবাড়িতে ধূপ বা শুকনো নিমপাতা পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করেন।

ধোঁয়া কি সত্যিই মশা তাড়ায়? বিজ্ঞান কী বলে?

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ধোঁয়া মশা তাড়াতে পারে, বিশেষ করে কাঠ কিংবা গাছের ডালপালা পোড়ানো ধোঁয়া মশার জন্য বেশ যন্ত্রণাদায়ক। যদি সেই পোড়ানো কাঠে প্রাকৃতিকভাবে মশা তাড়ানোর উপাদান সিট্রোনেলা, পাইরেথ্রাম বা ল্যাভেন্ডার থাকে, তবে তা আরও বেশি কার্যকর হয়।

  • সিট্রোনেলা: এটি একধরনের ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ, যা দেখতে লেমনগ্রাসের মতো। এর পাতার তেল মশা তাড়াতে দারুণ কাজ করে। আমাদের দেশের নার্সারি থেকে এই গাছ সংগ্রহ করে এর পাতা শুকিয়ে ধোঁয়ায় ব্যবহার করা যায়।
  • পাইরেথ্রাম: এটি একধরনের চন্দ্রমল্লিকা ফুল, যার প্রাকৃতিক উপাদান মশা ও পোকা তাড়াতে দারুণ কার্যকর। এমনকি অনেক কয়েলেও এটি ব্যবহার করা হয়।
  • ল্যাভেন্ডার: ল্যাভেন্ডার ফুলের সুগন্ধ মশা একদম সহ্য করতে পারে না। তাই এই গাছের শুকনো ডাল বা ফুল পোড়ালে যে ধোঁয়া হয়, তা মশা তাড়াতে বেশ কাজে দেয়। এখন আমাদের দেশেও অনেকে শৌখিনভাবে টবে ল্যাভেন্ডার চাষ করছেন, যা প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।

ধূপের ব্যবহার: একটি জনপ্রিয় প্রাকৃতিক সমাধান

আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই ধূপের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। ধূপ মূলত বিভিন্ন গাছের সুগন্ধি আঠা বা নির্যাস থেকে তৈরি করা হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলায় ঘরবাড়িতে মাটির মালসায় কয়লা বা নারকেলের ছোবড়া জ্বালিয়ে এর ওপর ধূপের গুঁড়ো দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয়। এই কড়া ধোঁয়া ও সুগন্ধ মশার ঘ্রাণশক্তিকে সাময়িকভাবে অকেজো করে দেয়, ফলে মশা কামড়াতে পারে না। প্রাকৃতিক ও রাসায়নিকমুক্ত হওয়ায় অনেক পরিবারেই আজও মশা তাড়ানোর সহজ সমাধান হিসেবে ধূপের ধোঁয়া ব্যবহার করা হয়।

ধোঁয়ার কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

মশার শরীরে অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু রিসেপ্টর বা ঘ্রাণ নেওয়ার কোষ থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, ধোঁয়া মূলত এই রিসেপ্টরগুলোকে সরাসরি আক্রমণ করে। ধোঁয়ার গন্ধে মশা এতটাই অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে যে এরা আর শিকারের শরীরের গন্ধ শুঁকে কাছে আসতে পারে না। ধোঁয়া মশার ঘ্রাণশক্তিকে একধরনের গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়, ফলে বিরক্ত হয়ে এরা অন্য কোথাও উড়ে যায়।

মশা তাড়াতে ধোঁয়ার পাশাপাশি এর তাপও বড় ভূমিকা রাখে। আগুন থেকে আসা গরম বাতাসের কারণে মশা ও অন্যান্য ক্ষতিকর পতঙ্গ সেই জায়গা থেকে দূরে থাকে। তা ছাড়া ধোঁয়ায় ভরা ভারী বাতাসের মধ্য দিয়ে উড়ে চলা পোকামাকড়দের জন্য বেশ কঠিন কাজ। তাই ধোঁয়ার উপস্থিতি টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এরা দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়।

ধোঁয়ার সীমাবদ্ধতা ও ব্যবহারের পরামর্শ

তবে ধোঁয়ার একটি সীমাবদ্ধতা আছে। বাইরে যদি খুব বাতাস থাকে, তবে ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ও পাতলা হয়ে যায়। ফলে বাতাসের কারণে এর কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। তাই বাতাসের গতি বিবেচনা করে ধোঁয়া ব্যবহার করা উচিত, যাতে এর প্রভাব সর্বোচ্চ হয়।

মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে বিমানবন্দরের ফটকগুলোতেও ধূপ জ্বালানো হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক সুরক্ষার একটি উদাহরণ। এই পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব এবং স্বাস্থ্যসম্মত, যা দীর্ঘমেয়াদে মশা নিধনে সহায়ক হতে পারে।