আপনার কি খুব ক্লান্ত লাগে? শরীর দুর্বল মনে হয়? হাঁটাচলার সময় নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়? বুক ধরফর করে? হাত-পা ঠান্ডা থাকে? এই লক্ষণগুলো শরীরে আয়রনের অভাবে রক্তশূন্যতার কারণে হতে পারে। অনেকেই এই সমস্যায় ভোগেন কিন্তু বুঝতে পারেন না। নারীদের ক্ষেত্রে এটি খুবই সাধারণ, কারণ প্রতি মাসে মাসিকের রক্তের সঙ্গে আয়রন বের হয়ে যায়। বিশেষ করে যাদের বেশি রক্তপাত হয়, তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যার সম্ভাবনা আরও বেশি।
অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা যে রক্তশূন্যতার কারণে হতে পারে, তা অনেকেরই অজানা। অনেকে মনে করেন, তাদের শরীর স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল, ফলে আয়রনের অভাবে রক্তশূন্যতা ধরা পড়ে না এবং চিকিৎসাও হয় না। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর রোগটি শরীরে বাসা বাঁধলে আরও অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে, ফলে বারবার জ্বর-কাশি, প্রসবের রাস্তার ইনফেকশনসহ বিভিন্ন সংক্রমণ হতে পারে। এমনকি হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের জটিল সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
দুর্বলতা নিয়ে গর্ভধারণের ঝুঁকি
দুর্বলতা নিয়ে গর্ভধারণ করলে গর্ভের শিশুর নানা সমস্যা হতে পারে। সময়ের আগে প্রসব হতে পারে, জন্মের সময় শিশুর ওজন কম হতে পারে। আবার কারো কারো আয়রনের অভাবে প্রচুর চুল পড়ে যেতে পারে। সাধারণত প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক, কিন্তু অতিরিক্ত চুল পড়ার একটি কারণ হতে পারে আয়রনের অভাব।
রক্তশূন্যতার লক্ষণ
রক্তশূন্যতার সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে: শরীরে শক্তি কম পাওয়া বা দুর্বল লাগা, বুক ধরফর করা, হাঁটাচলার সময় শ্বাসকষ্ট হওয়া, চোখ-মুখ ফ্যাকাসে লাগা, মাথাব্যথা, মনোযোগ দিতে সমস্যা হওয়া বা চিন্তা করতে অসুবিধা হওয়া। এছাড়াও কিছু বিশেষ লক্ষণ দেখা যায়, যেমন: পা কামড়ানো বা পায়ে শিরশির ভাব, বিশেষ করে সন্ধ্যা বা রাতে, যাকে ডাক্তারি ভাষায় রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম বলে। কানে ভনভন বা অস্বস্তিকর শব্দ শোনা, মুখের স্বাদ পরিবর্তন, জিভে বা ঠোঁটের কোণায় ঘা, চুল বেশি পড়া, গায়ে চুলকানি, অখাদ্য বস্তু (যেমন মাটি, কাগজ, বরফ) খেতে ইচ্ছা করা, ঢোক গিলতে কষ্ট হওয়া, নখ চামচের মতো দেবে যাওয়া ইত্যাদি। এই লক্ষণগুলোর মধ্যে কোনোটি থাকলে অবশ্যই ডাক্তার দেখানো উচিত।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
ডাক্তার কথা বলে ও শারীরিক পরীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করবেন যে আপনার আয়রনের অভাবে রক্তশূন্যতা আছে কিনা। খুব সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ ধরা যায়, যার খরচ খুব বেশি নয়। সরকারি হাসপাতালে ১৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে করা যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটু বেশি খরচ হয়। চিকিৎসাও সহজ: রোগ ধরা পড়লে সাধারণত আয়রন ট্যাবলেট খেতে দেওয়া হয়। টানা কয়েক মাস, সাধারণত ছয় মাস, ট্যাবলেট খেলে ঘাটতি পূরণ হয়ে শরীরে পর্যাপ্ত আয়রন মজুদ হয়। কারো কারো পেটে গণ্ডগোল হলে ভরা পেটে ট্যাবলেট খেলে সমস্যা কমে।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার
আয়রন ট্যাবলেটের পাশাপাশি আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি, এমনকি আয়রনের অভাব না থাকলেও নিয়মিত খাওয়া উচিত, কারণ মাসিকের মাধ্যমে প্রতিমাসে কিছু আয়রন বেরিয়ে যায়। আয়রনের ভালো উৎস হলো:
- কলিজা: বিশেষ করে গরুর কলিজা আয়রনের খুব ভালো উৎস। তবে গর্ভকালীন সময়ে কলিজা খাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো, অল্প পরিমাণে খেলে চিন্তার কিছু নেই।
- মাংস: গরুর মাংস ও মুরগির মাংস থেকেও ভালো পরিমাণে আয়রন পাওয়া যায়। গরুর মাংস পরিমাণমতো খাওয়া উচিত।
- ডাল: মসুর ডাল, মুগ ডাল, মাসকলাইয়ের ডাল ঘন করে খেলে বেশি আয়রন পাওয়া যায়।
- ডিম: সহজলভ্য এবং আয়রনের ভালো উৎস।
- শাক: পালং শাক, পুঁই শাক, লাল শাক, কচু শাক, ডাটা শাক, লাউ শাক, পাট শাক—বিভিন্ন শাক থেকে আয়রন পাওয়া যায়।
- অন্যান্য: ছোলা, মটরশুঁটি, ব্রকলি, খোসাসহ আলু, টমেটো ইত্যাদি থেকেও কিছু আয়রন পাওয়া যায়।
সবশেষে, এই লক্ষণগুলো থাকলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সঠিক চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে আয়রনের ঘাটতি পূরণ করে সুস্থ থাকুন।



