পরিষ্কার আকাশে বজ্রপাত: বাংলাদেশে উদ্বেগজনক প্রবণতা
পরিষ্কার আকাশে বজ্রপাত: বাংলাদেশে উদ্বেগজনক প্রবণতা

ঝড়, বৃষ্টি বা মেঘের সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াও দেশে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে— এমন উদ্বেগের কথা জানা গেছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘বোল্ট ফ্রম দ্য ব্লু’ বা পরিষ্কার আকাশের বজ্রপাত। শুনতে খানিকটা নতুন শোনা গেলেও পৃথিবীতে এমন ঘটনা প্রথম নয়। তবে দেশে এ নিয়ে সচেতনতা খুব একটা নেই। বোল্ট ফ্রম দ্য ব্লু-কে নিরব ঘাতক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মার্চ-এপ্রিলে বজ্রপাতে ৩২ জনের মৃত্যু

দেশে মার্চ-এপ্রিলে বজ্রপাতে ৩২ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে এই ৩২ জনের মধ্যে ঠিক কত জন পরিষ্কার আকাশে বজ্রপাতে মারা গেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বজ্রপাত নিয়ে কাজ করা সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্ট্রোর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) তরফ থেকে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট করে এই ৩২ জনের মধ্যে ক’জন পরিষ্কার আকাশে বজ্রপাতের কারণে মারা গেছেন— তা এসএসটিএএফ নিশ্চিত করতে পারেনি।

আবহাওয়াবিদদের মতামত

বিষয়টি নিয়ে আবহাওয়াবিদদের কাছে জানতে চাইলে— তারাও বলছেন, দেশে পরিষ্কার আকাশে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। সব মিলিয়ে তাদের হিসেবে ২০১৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বজ্রপাতে মারা গেছেন ১ হাজার ৯৮১ জন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঝুঁকিতে কৃষক ও বাইরে অবস্থানরত মানুষ

প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক ও বাইরে অবস্থানরত মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকছেন। প্রতি বছর প্রাক-মৌসুমী কালবৈশাখী হিসেবে মার্চ থেকে মে-জুন মাসকে বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে বজ্রঝড় বা কালবৈশাখীর প্রকোপ বেশি থাকায় এ সময়েই দেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যদিও পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার লেক মারাকাইবো অঞ্চলে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসার তথ্য অনুযায়ী, এই হ্রদ এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে গড়ে ২৩৩টি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। যা একে বিশ্বের বজ্রপাতের রাজধানী হিসেবে পরিচিত করেছে। কিন্তু বছরে এসব বজ্রপাতে মাত্র তিন জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। অপরদিকে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে এর চেয়ে অনেক কম পরিমাণ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটলেও মৃত্যুর সংখ্যায় সুনামগঞ্জের অবস্থান সারা বিশ্বে এক নম্বরে উঠে এসেছে।

আবহাওয়াবিদ শাহনাজ সুলতানা কী বলছেন

পরিষ্কার আকাশে বজ্রপাত বিষয়ে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ শাহনাজ সুলতানা বলেন, “বজ্রপাতের অনেক ধরন আছে তারমধ্যে একটি হচ্ছে— বিনা মেঘেই বজ্রপাত। তবে এর পরিমাণ খুবই কম। আমাদের দেশে যে হারে লোক মারা যায় সেটা ক্লাউড টু গ্রাউন্ড। মূল কথা হলো— যে বজ্রপাতই হোক তার শব্দ হবে আগে। সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হবার কোনও বিকল্প নেই। আমাদের একটা শ্লোগান আছে ‘শুনলে বজ্রধ্বনি ঘরে যাবে তখনই’।”

৩২ জনের মারা যাবার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই ডাটাকে আমরা ভেরিফাই করতে পারি না। তবে গণমাধ্যমে এসব নিউজ এই সময় হতেই থাকে। কারণ এই মৌসুমে মৃত্যু হয় বেশি— বজ্রপাতে মৃত্যু যেন থামছেই না। আমরা বারবার সতর্ক করছি। বেশি আগে এই সতর্কতা দেওয়াও যায় না। কিন্তু খুব একটা কাজও হচ্ছে না। শব্দ হবার পর পর আধা ঘণ্টা যদি একটা সেল্টারে গিয়ে থাকা যায় তাহলেই এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।”

তিনি বলেন, “বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা অঞ্চলে এই সময় ধান কাটার মৌসুম চলে। এই মৌসুমে কৃষকরা দিন চুক্তিতে কাজ করে। ফলে কেউই-ই অর্থাৎ মালিকরা বা কৃষকরা সতর্কতা হিসেবে আধা ঘণ্টার জন্য সেল্টারে যেতে চায় না। এই সময়েই ঘটে দুর্ঘটনা। এই থেকে বের হবার একটাই উপায় সবাইকে সচেতন হতেই হবে। দ্বিতীয় কোনও ব্যবস্থা নেই।”

সাত বছরে ১৯৮১ জনের মৃত্যু

সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্ট্রোর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, “আমাদের স্বেচ্ছাসেবীরা এবং পত্রিকার খবর নিয়ে আমরা এই তথ্য সংগ্রহ করেছি। চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে এই পর্যন্ত ৩২ জন মারা গিয়েছেন। এর আগের বছরগুলো হিসাব করলে ২০১৯ সাল থেকে এই পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৯৮১ জন মারা গেছেন। এর আগে ২০২৫ সালে সব মিলিয়ে মারা গেছেন ৩৩০ জন। ২০২৪ সালে ২৯৭ জন, ২০২৩ সালে ২৪৫ জন, ২০২২ সালে ২৭৭, ২০২১ সালে ৩০৫, ২০২০ সালে ২৩০ এবং ২০১৯ সালে ২৬৫ জন মারা গেছেন।”

তিনি বলেন, “সাধারণত বছরের এই সময়ে অর্থাৎ মার্চ ও এপ্রিল মাসে বজ্রপাতে মারা যাবার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। আমরা এই বজ্রপাত থেকে রক্ষার জন্য এলাকায়-এলাকায় গিয়ে কৃষকদের সচেতন করি। বজ্রপাত হলে কৃষকেরা কীভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখবেন সেই কৌশল জানাতে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করি। কৃষকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া পরামর্শ ও নির্দেশনাগুলোর মধ্যে আছে, ঝড়-বৃষ্টির সময় কোনোভাবেই খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে ভেজা ও গাছের নিচে থাকা যাবে না, ফসলের মাঠ, নদী-নালা, পুকুর, ডোবা, জলাশয়ে থাকলে দ্রুত আশপাশের কোনও দালান কিংবা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে, বৃষ্টির সময় ছেলে-মেয়েদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন এবং নিজেদেরও বিরত থাকতে হবে।”

রাশিম মোল্লা জানান, ঝড় বৃষ্টির মধ্যে যেমন বজ্রপাত হয়। এটা স্বাভাবিক কিন্তু এখন বিনা বৃষ্টি বা ঝড়েও— এই বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। তাই শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কোনও পথ নেই।

এদিকে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতেও বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে বিকাল ও সন্ধ্যার দিকে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি।

বাঁচতে যা করবেন

আবহাওয়া অধিদফতর পরামর্শ দিয়েছে, বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় না থাকা, উঁচু গাছ বা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং যত দ্রুত সম্ভব পাকা ভবনের ভেতরে অবস্থান নেওয়ার জন্য। পাশাপাশি নদী বা জলাশয়ে থাকা নৌযানগুলোকে নিরাপদ স্থানে রাখার কথাও বলা হয়েছে।

বাংলাদেশে কেন এত বেশি বজ্রপাত

বাংলাদেশে কেন এত বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে— এমন প্রশ্নে ৬টি কারণকে চিহ্নিত করেছেন আবহাওয়াবিদরা। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় বাতাস অত্যন্ত আর্দ্র থাকে। একই সঙ্গে উত্তর দিকের হিমালয় ও ভারতের মেঘালয় থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে এখানে মিশে দ্রুত মেঘ তৈরি করে, যা বজ্রপাতের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে মেঘে ইলেকট্রিক্যাল চার্জ বা আধান তৈরির প্রক্রিয়া তীব্রতর হচ্ছে।

বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে বড় বড় গাছ বিশেষ করে তাল, নারকেল থাকতো। যা বজ্রপাত শোষণ করে নিতো। বড় গাছ কমে যাওয়ার কারণে বজ্রপাত সরাসরি মাটিতে পড়ে এবং মানুষের হতাহতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, রবিবার (২৬ এপ্রিল) দুপুর থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বৃষ্টির মধ্যে চার জেলায় বজ্রাঘাতে অন্তত আট জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গাইবান্ধায় চার জন, সিরাজগঞ্জে দু’জন, বগুড়ায় একজন ও পঞ্চগড়ে একজন।