রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। বাইরে থেকে শান্ত-নিরিবিলি মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই বদলে যায় চিত্র। শিশুদের বাঁচাতে চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা আর স্বজনদের উৎকণ্ঠা ও কান্নায় ভারী হয়ে আছে পরিবেশ। সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে এখানে ছুটে আসছেন বাবা-মা ও স্বজনরা।
হাসপাতালের করুণ চিত্র
হাসপাতালটির দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত ভর্তি ছোট ছোট শিশু। বেড না পেয়ে অনেকেই মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। কারও শরীরে অক্সিজেন, কারও হাতে-পায়ে ক্যানোলা। অনেক শিশুর শরীর ও মুখ হামের লাল দাগে ভরা। কষ্টে কেঁদে উঠছে তারা, আর পাশে বসে মা-বাবারা চেষ্টা করছেন তাদের শান্ত করতে। রবিবার (২৬ এপ্রিল) সরেজমিনে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
শিশু সুমাইয়ার মায়ের কান্না
তৃতীয় তলার একটি ওয়ার্ডে মেঝেতে চিকিৎসাধীন ৯ মাস বয়সী শিশু সুমাইয়া। সঙ্গে তার মা সিমা। ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন তিনি। কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে সিমার। তিনি বলেন, '১০-১২ দিন ধরে বাচ্চার জ্বর। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়ালেও ভালো হয়নি। উল্টো শরীর খারাপ হতে থাকে। পরে গায়ে লাল দাগ দেখা দিলে শনিবার হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার দেখে ভর্তি দিয়েছেন।' কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তার, 'ভাই, আমার মেয়ে চোখ খুলছে না। কত দোয়া করছি—একবার যেন তাকায়। কিন্তু দুই দিন ধরে চোখই খুলছে না।' কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'এটা আমার প্রথম সন্তান। আমাদের সংসারও ভালো না। আল্লাহ কেন এমন রোগ দিলো।'
ঝিনাইদহ থেকে আসা নাতনি
ঝিনাইদহ থেকে আসা খুশি বেগম প্রায় এক মাস ধরে ১০ মাস বয়সী নাতনি জান্নাতকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরছেন। বর্তমানে ১০ দিন ধরে তিনি এই হাসপাতালে আছেন। তিনি বলেন, 'প্রথমে ডায়রিয়া হয়েছিল। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েছি। পরে মাগুরা হাসপাতালে নেই। সেখানে ডায়রিয়া ভালো হলেও গায়ে লাল দাগ দেখা দেয়। এরপর ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাই। অবস্থার অবনতি হলে এখানে নিয়ে আসি।' তিনি জানান, শিশুটির আইসিইউ প্রয়োজন হয়েছিল এবং এখানে কিছুদিন আইসিইউতে চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে। এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে। 'আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, যেন দ্রুত সুস্থ হয়।'
যমজ শিশু ইয়ান ও আয়ান
গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে আসা ৮ মাস বয়সী যমজ শিশু ইয়ান ও আয়ানকে নিয়ে উদ্বেগে আছেন তাদের পরিবার। মা, দাদি ও নানি মিলে দেখভাল করছেন। দাদি রাবেয়া বেগম বলেন, 'প্রথমে জ্বর ছিল। পরে গায়ে লাল দাগ দেখা যায়। প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাই। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে শুক্রবার এখানে নিয়ে আসি। এখন দুই দিনের চিকিৎসায় কিছুটা ভালো।' তিনি বলেন, 'আমরা খুব চিন্তায় ছিলাম। এখন ডাক্তার-নার্সরা আন্তরিকভাবে দেখছেন, তাই কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।'
হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ছোট শিশুদের আঁকড়ে ধরে বসে আছেন স্বজনরা। কেউ বেডে, কেউ মেঝেতে। কারও চলছে অক্সিজেন, কারও ক্যানোলা। এমন দৃশ্য সহজেই নাড়িয়ে দেয় যে কাউকে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে ভর্তি শিশুদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা। তারা মূলত হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৭৪ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আউটডোরে ৪০ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং নতুন করে ভর্তি করা হয়েছে ২০ জনকে।
চিকিৎসকের পরামর্শ
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এ আসমা খান বলেন, 'রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। গত ৫ এপ্রিল টিকাদান কার্যক্রমের পর কিছুটা কমেছিল, তবে গত কয়েক দিনে আবার বাড়ছে। শহরের তুলনায় গ্রামের রোগী বেশি আসছে।' তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, 'শুরুতেই ঢাকায় আনার প্রয়োজন নেই। উপসর্গ দেখা দিলে আগে নিকটস্থ উপজেলা হাসপাতালে নিতে হবে। সেখানে না হলে জেলা শহরের হাসপাতালে যান। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজন হলে পরে ঢাকায় আনতে হবে।' তিনি আরও বলেন, 'জেলা হাসপাতালগুলোতেও এখন ভালো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে।' আতঙ্কিত হয়ে অযথা ঢাকামুখী না হওয়ার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।



