১৯৮৬ সালের ২৬শে এপ্রিল, রাত ১টা ২৩ মিনিটে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেনে অবস্থিত চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয়। একটি সাধারণ পরীক্ষার ভুল পদক্ষেপ থেকে সৃষ্ট সেই দুর্ঘটনা নিমিষেই বদলে দিয়েছিল পারমাণবিক শক্তির ভবিষ্যৎ এবং কোটি মানুষের জীবন। চেরনোবিল শব্দটি উচ্চারণ করলেই আজও আমাদের চোখে ভেসে ওঠে জনশূন্য এক ভৌতিক শহর কিংবা তেজস্ক্রিয়তায় বিকৃত কোনো প্রাণীর ছবি। চার দশক পেরিয়ে এসে বর্তমানে চেরনোবিলের প্রকৃত চিত্রটা কি ঠিক এমনই? নাকি সময়ের পরিক্রমায় বদলে গেছে সবকিছু? এটি কি আসলেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক দুর্যোগ ছিল, নাকি সবই অতিরঞ্জিত? এই লেখায় আমরা চেরনোবিলকে ঘিরে থাকা এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।
ইনেস স্কেল ও চেরনোবিলের অবস্থান
প্রথমেই শুরু করা যাক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর পারমাণবিক দুর্ঘটনা হিসেবে এর আখ্যা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে। এর উত্তর পেতে হলে আমাদের চোখ রাখতে হবে ইনেস স্কেলে। পারমাণবিক ঘটনার ভয়াবহতা বোঝার জন্য এটি একটি আন্তর্জাতিক মাপকাঠি। এর পূর্ণাঙ্গ রূপ দ্য ইন্টারন্যাশনাল নিউক্লিয়ার অ্যান্ড রেডিওলজিক্যাল ইভেন্ট স্কেল। এটি অনেকটা ভূমিকম্প মাপার রিখটার স্কেলের মতো, যার প্রতিটি স্তর তার আগেরটির চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী।
স্কেলটিতে মোট ৭টি স্তর রয়েছে, যা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। লেভেল ১ থেকে ৩-কে চিহ্নিত করা হয় ঘটনা হিসেবে। লেভেল ৪ থেকে ৭-কে দুর্ঘটনা। এগুলোর বাইরে শূন্য লেভেলের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় পারমাণবিক-সংক্রান্ত সাধারণ বিচ্যুতির ঘটনাগুলোকে। ১৯৯০ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ও নিউক্লিয়ার এনার্জি এজেন্সি যৌথভাবে এই স্কেলটির প্রবর্তন করে।
ইনেস স্কেলের সর্বোচ্চ ধাপ লেভেল ৭ নির্দেশ করে এমন সব মারাত্মক দুর্ঘটনাকে, যাতে ব্যাপক পরিমাণে তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটে। চেরনোবিল দুর্ঘটনা এবং ২০১১ সালের মার্চ মাসে সংঘটিত ৯ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প ও পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট সুনামির আঘাতে জাপানের ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘটা ভয়ংকর বিপর্যয়—উভয়কেই এই স্তরে রাখা হয়েছে। স্কেলের একই স্তরের অন্তর্ভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনটি বড় বা কোনটি ছোট, তা আলাদা করার সুযোগ আপাতত নেই।
তেজস্ক্রিয়তার তুলনামূলক চিত্র
পারমাণবিক বিপর্যয় শব্দটিকে কেবল নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের ঘটনা বা দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে যদি মানুষের সৃষ্ট তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নিঃসরণ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এমন অনেক ঘটনার নজির পাওয়া যাবে, যেখানে তেজস্ক্রিয় দূষণের মাত্রা চেরনোবিলের চেয়েও অনেক বেশি ছিল! উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, পারমাণবিক বোমার অন্যতম মূল উপকরণ প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের প্ল্যান্টগুলোর কথা। মার্কিন ও সোভিয়েত মালিকানাধীন এই পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর প্রতিটি দৈনন্দিন কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই নিজেদের জীবনকালে (৩০-৪০ বছর) পরিবেশে অন্তত ৩৫০ মিলিয়ন কুরি তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়েছে! কুরি তেজস্ক্রিয়তার একটি একক। কোনো পদার্থ থেকে প্রতি সেকেন্ডে কত দ্রুত তেজস্ক্রিয় ক্ষয় হচ্ছে, তা মাপার জন্য এই একক ব্যবহার করা হয়। ১ কুরি মানে, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন পরমাণু ক্ষয় হচ্ছে। বিজ্ঞানী মেরি কুরির নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং চেরনোবিল ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী, দুর্ঘটনার কয়েক দিনের ব্যবধানে চেরনোবিলের ৪ নম্বর রিঅ্যাক্টর থেকে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয় পদার্থের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ ২০০ মিলিয়ন কুরি। এ ছাড়া বিগত শতাব্দীর হাজারো পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার সময়ে যে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তার মাত্রাও অকল্পনীয়। শুধু একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ আয়োডিন-১৩১ মানবদেহের থাইরয়েডে জমা হয়ে ক্যানসার সৃষ্টি করে। চেরনোবিলে যেখানে এই আইসোটোপটি আনুমানিক ৪৫ মিলিয়ন কুরি নির্গত হয়েছিল, সেখানে মাত্র দুই বছরের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষায় সোভিয়েত ও মার্কিনিরা ২০ বিলিয়ন কুরি তেজস্ক্রিয় আয়োডিন-১৩১ ছড়িয়েছিল! বলা বাহুল্য, দুর্ঘটনা বা মানবিক ভুল নয়, এমন কর্মযজ্ঞের পুরোটাই ছিল পূর্বপরিকল্পিত।
চেরনোবিল শহর ও প্রিপিয়াত: ভৌতিক নাকি সক্রিয়?
চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মূল চেরনোবিল শহরের দূরত্ব প্রায় ১৪ থেকে ১৫ কিলোমিটার। তবে এটিই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সবচেয়ে নিকটবর্তী লোকালয় নয়। এর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে তৈরি করা হয়েছিল আরেকটি ছোট্ট শহর, যার নাম প্রিপিয়াত। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মীরাই মূলত এখানে থাকতেন। ২৬ এপ্রিল দুর্ঘটনা ঘটার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে সেই শহরের প্রায় ৫০ হাজার বাসিন্দাকে দ্রুত নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, এমন জরুরি পরিস্থিতির মেয়াদকাল সম্ভবত মাত্র কয়েক দিন, অচিরেই তাঁরা ঘরে ফিরবেন। পুরো সময়টুকুতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অ্যাপার্টমেন্টগুলোর পাহারায় নিয়োজিত থাকবেন। কিন্তু বাসিন্দাদের অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয়নি। অদ্যাবধি এলাকাটিতে মানুষের স্থায়ী বসবাস নিষিদ্ধ। এ জন্য চাইলে একে ভৌতিক নগরী বলা যেতেই পারে।
একই কথা অবশ্য চেরনোবিল শহরের বেলায় খাটে না। দুর্ঘটনার পর সেখান থেকে সব বাসিন্দা সরাতে সময় লেগেছিল বাড়তি আরও কয়েক দিন। মোটামুটি মে মাসের মধ্যে চেরনোবিল শহর ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের ৩০ কিলোমিটার এলাকার প্রায় ৬৭ হাজার মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়। তবে শহরটি সেই অর্থে কখনোই জনশূন্য থাকেনি। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া হাজার হাজার কর্মী এই শহর এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশে ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ঘোষিত নিষিদ্ধ এলাকার বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা অস্থায়ী ক্যাম্প বা তাঁবু থেকে তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। চেরনোবিল শহরটি দুর্ঘটনাস্থল থেকে খানিকটা দূরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে রেডিয়েশনের মাত্রা ছিল তুলনামূলক সহনীয়। ফলে উদ্ধারকারীদের থাকার জায়গা, প্রশাসনিক অফিস এবং কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে এই শহরটিই ছিল প্রথম পছন্দ।
একটা মজার তথ্য দেওয়া যাক। অনেকেরই ধারণা, ভয়ংকর বিস্ফোরণের পর সম্পূর্ণ চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রমই চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটি একদমই সত্য নয়। ১৯৮৬ সালে দুর্ঘটনা ঘটার আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে সচল রিঅ্যাক্টরের সংখ্যা ছিল চার। এর মধ্যে কেবল ৪ নম্বর ইউনিটটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বাকি তিনটি রিঅ্যাক্টর পরিষ্কার ও সংস্কার করে পুনরায় চালু করা হয়েছিল। ১ ও ২ নম্বর ইউনিটকে সেই বছরের শেষ দিকে, আর ৩ নম্বর ইউনিটকে পরের বছরের শেষ দিকে চালু করা হয়। এগুলো যথাক্রমে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। নিঃসন্দেহে সেই ইউনিটগুলোতে কাজ করা ছিল তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশ চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই আসত। হঠাৎ করে তিনটি বড় ইউনিট বন্ধ করে দিলে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা ছিল শতভাগ।
চেরনোবিলের সচল তিনটি ইউনিটে কয়েক হাজার কর্মী কাজ করতেন। বিকিরণের ঝুঁকি কমানোর জন্য তাঁরা ১৫ দিনের রোটেশনে কাজ করতেন। অর্থাৎ, মাসের অর্ধেক কাজ, বাকি সময় ছুটি। তাঁদের শিফট হতো সাধারণত ৮ ঘণ্টার। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত এই কর্মীরা চেরনোবিল শহরেই রাত্রিযাপন করতেন। পরে তাঁদের জন্য গড়ে তোলা হয় নতুন একটি আধুনিক শহর, যার নাম স্লাভুতিচ। এর অবস্থান বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে, অর্থাৎ নিষিদ্ধ জোনের বাইরে। অবশ্য যেসব কর্মী প্রতিদিন এত দূরে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না, তাঁদের জন্য চেরনোবিল শহরেই বিশেষ হোস্টেলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখনো এই রীতি প্রচলিত আছে।
নিউ সেফ কন্টেইনমেন্ট: সুরক্ষার বিশাল আচ্ছাদন
বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত ৪ নম্বর রিঅ্যাক্টরকে ঘিরে বসানো হয়েছে বিশালাকার একটি আর্চ-আকৃতির কাঠামো। এর নাম দেওয়া হয়েছে নিউ সেফ কন্টেইনমেন্ট। এর মূল উদ্দেশ্য, ভেতরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক জ্বালানি থেকে পরিবেশে তেজস্ক্রিয় রশ্মির নির্গমন সীমিত করা এবং তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা সহজে বাতাসে ছড়ানো রোধ করা। এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১০ সালে। প্রায় ৩০ তলা ভবনের সমান উঁচু এই অতিকায় স্থাপনা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে ৩১ হাজার টনেরও বেশি ইস্পাত। অর্থাৎ, তিনটি আইফেল টাওয়ারের সমান! নির্মাণকাজ শেষে ২০১৬ সালের নভেম্বরে হাইড্রোলিক জ্যাকের সাহায্যে রেলপথের মাধ্যমে এটিকে রিঅ্যাক্টরকে ঘিরে বসানো হয়। কাঠামোর ভেতর ও বাইরের দেয়ালের মাঝে একটি বিশেষ বায়ুচলাচল সিস্টেম রয়েছে। সেখানে শুষ্ক ও গরম বাতাস কিছুটা উচ্চ চাপে রাখা হয়। ফলে তেজস্ক্রিয় কণাগুলো বাইরে বের হতে বাধা পায়। এ ছাড়া এটির ভেতরে থাকা বিশেষ ক্রেন সিস্টেমে সুরক্ষার জন্য ৮ ইঞ্চি পুরু সিসার আবরণযুক্ত বিশেষ শিল্ডেড বক্স রয়েছে। এটির সুবাদে কর্মীরা অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার বিকিরণ এলাকাতেও নিরাপদে কাজ করতে পারেন।
নিউ সেফ কন্টেইনমেন্টকে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যেন তা পরবর্তী ১০০ বছর পর্যন্ত তেজস্ক্রিয়তা আটকে রাখতে পারে। এর উপস্থিতিতে আশপাশের এলাকায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা ৩ থেকে ৪ গুণ কমে গেছে। প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নির্মিত এই স্থাপনাটি সব রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০১৯ সালে চূড়ান্তভাবে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত জনবলও পালা করে চেরনোবিল শহরে থাকেন। তাই শহরটিকে ভৌতিক তকমা দেওয়া কোনো দৃষ্টিতেই যথার্থ নয়।
বিকৃত প্রাণীর অস্তিত্ব: সত্যি নাকি মিথ?
চেরনোবিলের নিষিদ্ধ এলাকায় কি কোনো অস্বাভাবিক বা বিকৃত প্রাণীর অস্তিত্ব আছে? চেরনোবিলে ঘুরতে আসা পর্যটকদের পক্ষ থেকে ট্যুর গাইডদের কাছে করা সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রশ্ন বোধ হয় এটাই। মূলত কম্পিউটার গেম, হরর মুভি এবং বেশ কিছু চটকদার পত্রিকা এমন ধারণা ছড়িয়ে দিলেও বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি নেই। এক্সক্লুশন জোনের ভেতরে কখনোই দুই মাথাওয়ালা নেকড়ে বা পাঁচ পা-বিশিষ্ট ইঁদুর দেখতে পাওয়া যায়নি।
উচ্চ মাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাবে প্রাণীদেহে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, এটি সত্যি। তবে সিংহভাগ ক্ষেত্রে তা কেবল একটি জীবের টিকে থাকার ক্ষমতা বা জীবনীশক্তি কমিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে ইঁদুরের ভ্রূণ মারা যাওয়ার উচ্চ হারের কথা ভাবতে পারেন। জেনেটিক ত্রুটির কারণে এগুলো গর্ভাবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে। অর্থাৎ, বড় ধরনের কোনো শারীরিক বিকৃতি নিয়ে জন্মানোর আগেই প্রাণীরা মারা যায়। আবার কোনো প্রাণী যদি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা বিকৃতি নিয়ে জন্মেও যায়, তাহলেও তার শেষ রক্ষা হওয়ার আশঙ্কা খুব কম। কারণ, প্রাকৃতিক বন্য পরিবেশে টিকে থাকা বড্ড কঠিন। কেবল সুস্থ এবং শক্তিশালীরাই এখানে টিকে থাকে ও বিজয়ী হয়।
গবেষণাগারের চার দেয়ালের মাঝে বিজ্ঞানীরা যখন কোনো প্রাণীকে ইচ্ছাকৃতভাবে তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আনেন, তখন সেখানে অনেক অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। কিন্তু উন্মুক্ত পরিবেশের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। সেখানে রাজত্ব চলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের। এই কারণেই হাজার হাজার প্রাণীর ওপর গবেষণা চালিয়েও চেরনোবিল রেডিয়েশন অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের বাস্তুসংস্থান এবং উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল বিভাগের সদস্যরা নিষিদ্ধ জোনে কোনো অস্বাভাবিক প্রাণীর অস্তিত্ব খুঁজে পাননি।
চেরনোবিলে পর্যটন: নিরাপত্তা ও বর্তমান অবস্থা
আচ্ছা, চেরনোবিল কি পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য নিরাপদ? প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে চলুন সেই এলাকায় সমসাময়িক বিকিরণের অবস্থা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। বর্তমানে প্রিপিয়াত ও চেরনোবিল শহর এবং এক্সক্লুশন জোনে রেডিয়েশনের মাত্রা দুর্ঘটনার সময়ের তুলনায় কয়েক হাজার গুণ কমেছে। তবে এটি এখনো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
প্রিপিয়াতের বেশির ভাগ এলাকায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় ০.৯ থেকে ১.০ মাইক্রোসিভার্টের মধ্যে থাকে। এটি সাধারণ প্রাকৃতিক রেডিয়েশনের চেয়ে বেশি হলেও স্বল্প সময়ের জন্য সেখানে থাকা নিরাপদ। অন্যদিকে চেরনোবিল শহরে রেডিয়েশন অনেক কম, গড়ে প্রায় ০.১৮ থেকে ০.১৯, যা প্রায় স্বাভাবিকের কাছাকাছি। তেজস্ক্রিয়তার বিচারে বর্তমানে চেরনোবিলের সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকার নাম রেড ফরেস্ট। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ নম্বর রিঅ্যাক্টরের মাত্র ৪০০ মিটার দূর থেকে শুরু হয়ে ২ কিলোমিটার পশ্চিম পর্যন্ত এটি বিস্তৃত। এখানে তেজস্ক্রিয়তার গড় মান ১১.৭৫ মাইক্রোসিভার্ট থেকে শুরু হয়ে মাটির গভীরে আরও অনেক বেশি হতে পারে। দুর্ঘটনার পর তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বাতাসের মাধ্যমে সরাসরি এই বনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। তখন বিকিরণের আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে, পাইনগাছগুলো মারা গিয়ে লাল বর্ণ ধারণ করে। সেখান থেকেই মূলত রেড ফরেস্ট নামে উৎপত্তি। উদ্ধারকাজের সময় তেজস্ক্রিয় গাছগুলোকে কেটে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়। এ কারণে বনের মাটির নিচের স্তর অনেক বেশি বিপজ্জনক। বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য এই বনে প্রবেশ করা এখনো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া এইচবিওর মিনি টিভি সিরিজ চেরনোবিল-এর ঈর্ষণীয় সাফল্যের পর নিষিদ্ধ জোনে পর্যটকদের সংখ্যা এক ধাক্কায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় সংস্থা পর্যটকদের জন্য স্থল, জল ও আকাশপথে ভ্রমণের বেশ কিছু নিরাপদ রুট তৈরি করেছে। এগুলো দিয়ে যাওয়ার সময়ে বেশ কিছু কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। যেমন, শরীর পুরোপুরি ঢেকে রাখা, বাইরে খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করা ইত্যাদি।
এক দিনের ভ্রমণে একজন পর্যটক যে পরিমাণ রেডিয়েশন ডোজ গ্রহণ করেন, তার গড় মান প্রায় ০.১ মিলিসিভার্ট। ১ মিলিসিভার্ট সমান ১,০০০ মাইক্রোসিভার্ট। কেউ যদি জার্মানি থেকে জাপান পর্যন্ত একটি দীর্ঘ পাল্লার ফ্লাইটের যাত্রী হন, তাহলেও তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই পরিমাণ ডোজ গ্রহণ করবেন। এর উৎস ন্যাচারাল ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন ও মহাকাশ থেকে ছুটে আসা কসমিক রে। হাসপাতালে কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময়ে এর চেয়েও অনেক বেশি ডোজ গ্রহণের আশঙ্কা থাকে। যেমন পেলভিক এক্সরে ০.৩ থেকে ০.৭ মিলিসিভার্ট এবং বুকের সিটি স্ক্যানে ৪ থেকে ৭ মিলিসিভার্ট। অবশ্য এগুলোও মোটেই ক্ষতিকারক নয়। যাঁরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরাসরি তেজস্ক্রিয় উৎস নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের জন্য বাৎসরিক নিরাপদ সর্বোচ্চ ডোজের মান ২০ মিলিসিভার্ট। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও চেরনোবিলে পর্যটকদের ভ্রমণে তেমন কোনো বাধা দেখছে না। তাদের মতে, এক্সক্লুশন জোন এখন ভ্রমণের জন্য উন্মুক্ত। যদিও কিছু তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ, যেমন স্ট্রনশিয়াম-৯০ এবং সিজিয়াম-১৩৭ এখনো সেখানে রয়েছে গেছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা সহনশীল মাত্রার মধ্যেই থাকে।
তবে হাতে সময় আর পকেটভর্তি টাকা থাকলেও এখনই চেরনোবিলে ট্যুর প্ল্যান করে বসবেন না যেন! রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে এখন সেখানে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয়। গত বছরেই নিউ সেফ কন্টেইনমেন্টে আঘাত হেনেছে রাশিয়ান ড্রোন। ড্রোনের আঘাতে গম্বুজের বাইরের এবং ভেতরের ধাতব আবরণ ফুটো হয়ে যায়। ফলে ভেতরের অন্তরক স্তরে আগুন ধরে যায়, যা নেভাতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। এই ঘটনায় অবশ্য নতুন করে কোনো তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েনি। তবে মূল কাঠামোতে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হওয়ায় এটি বর্তমানে বিকিরণ রোধ করার প্রাথমিক সক্ষমতা হারিয়েছে। এটি মেরামত করতে কয়েক বছর সময় এবং প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ইউরো খরচ হতে পারে। সুতরাং সাবধান!



