পিরিয়ডের রক্ত অপবিত্রতা নয়, জীবনের স্পন্দন: মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ
পিরিয়ডের রক্ত অপবিত্রতা নয়, জীবনের স্পন্দন

বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্যবিধি (মেন্সট্রুয়াল হাইজিন) দিবস ছিল গত ২৮ মে। প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটি এসেছে, চলে গেছে। কিন্তু দিনশেষে আমাদের সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের সামনে রেখে গেছে এক মস্ত বড় প্রশ্ন—আমাদের ঘরের মেয়েটি, আমাদের বোনটি কি প্রতি মাসের ওই কয়েকটা দিন নিশ্চিন্তে, সম্মানের সঙ্গে শ্বাস নিতে পারছে? নাকি আজও পিরিয়ডের দিনগুলোতে তাকে এক দমবন্ধ করা সংকোচ আর তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে?

পিরিয়ড কোনও রোগ নয়, এটি মানবকুলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক শাশ্বত ও পবিত্র প্রাকৃতিক নিয়ম

অথচ আজও কোটি কোটি নারী ও কিশোরীর কাছে এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় অভিজ্ঞতাটি এক চরম অবমাননা, সীমাহীন স্বাস্থ্যঝুঁকি আর সামাজিক নিগ্রহের নাম। ২০২৬ সালের এই নতুন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে—মাসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা কোনও দয়া বা করুণা নয়, এটি নারীর মানবাধিকার এবং জাতীয় সাম্য ও প্রগতির অবিচ্ছেদ্য শর্ত।

সংবিধান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আলোকে মাসিক স্বাস্থ্য

আমাদের মহান সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয় ও চিকিৎসার মতো মৌলিক উপকরণের নিশ্চয়তা দেওয়া আছে। ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে—অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা। কিন্তু পিরিয়ডের ওই দিনগুলোতে স্যানিটারি প্যাডের অভাবে কিংবা স্কুলের ভাঙা, নোংরা টয়লেটের কারণে যখন একটি কিশোরী ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন কি তার শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় না?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংবিধানের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা উন্নত করার যে রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তার প্রথম শর্তই তো নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য। অনুচ্ছেদ ১৯ ও ২৮ যেখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যহীনতা ও সুযোগের সমতার ডাক দেয় এবং ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করে—সেখানে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী স্রেফ একটি জৈবিক নিয়মের কারণে প্রতি মাসে নোংরা কাপড়ের আড়ালে বন্দি থাকবে, তা আর মেনে নেওয়া যায় না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শুধু সংবিধানই নয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৬-এর লক্ষ্য অর্জনে, বিশেষ করে সবার জন্য সমতাভিত্তিক স্যানিটেশন ও হাইজিন (লক্ষ্যমাত্রা ৬.২) নিশ্চিত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকারে আমরা আবদ্ধ। যেখানে স্পষ্ট বলা আছে—নারী ও কিশোরীদের বিশেষ চাহিদার প্রতি সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। অথচ আমাদের ভেতরের বাস্তব চিত্রটি এখনও বেশ উদ্বেগের।

সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য ও বাস্তবতা

সাম্প্রতিক ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) প্রিলিমিনারি ফাইন্ডিংস ২০২৫’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সচেতনতা কিছু বাড়লেও প্রান্তিক নারী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিশোরীদের বড় অংশই এখনও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাসিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ পাচ্ছে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে স্যানিটারি প্যাড যেন সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের কাছে এক অলীক বিলাসিতা!

একই সঙ্গে, ‘ওয়াশ ইন এডুকেশনাল অ্যান্ড হেলথকেয়ারস ফ্যাসিলিটিজ সার্ভে ২০২৪’-এর উপাত্ত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মেয়েদের জন্য আলাদা, নিরাপদ এবং সাবান-পানিসহ কার্যকর ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার (এমএইচএম) চরম ঘাটতি রয়েছে। অনেক স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট থাকলেও তা ব্যবহারের অনুপযোগী। এই পরিকাঠামোগত অবহেলা আমাদের মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরিয়ে দিচ্ছে, ঠেলে দিচ্ছে জরায়ু ও প্রজননতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ইনফেকশনের দিকে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার

আশার কথা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখন এই নীরব সংকট নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল এই বিষয়ে বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও নারী ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে প্রান্তিক নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীবান্ধব স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করেছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ঘোষিত কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের ইশতেহারে নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতে প্রান্তিক ও দরিদ্র নারীদের বিনামূল্যে এবং স্বল্পমূল্যে প্রজনন স্বাস্থ্যসামগ্রী ও পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদানের কথা স্পষ্টাক্ষরে বলেছে। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)-সহ অন্যান্য প্রগতিশীল দলও (এনসিপি জোট) তাদের নগর ও স্বাস্থ্যনীতিতে নারীদের জন্য নিরাপদ গণশৌচাগার ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পিরিয়ডকালীন পরিবেশ তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

বিদ্যমান নীতিমালা ও কৌশলপত্র

দলগুলোর এই রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে স্বাগত জানিয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে—আমাদের আছে ‘জাতীয় মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা কৌশলপত্র ২০২১’। এর সাথে যোগ হয়েছে ‘ন্যাশনাল প্রো-পুওর স্ট্র্যাটেজি ২০২০’ (দরিদ্রবান্ধব কৌশল), এবং ‘জাতীয় হাইজিন প্রমোশন কৌশলপত্র ২০২৪’। এছাড়া ‘এস্টিমেটেড অ্যাকশন প্ল্যান ২০২৫’ এবং দূরদর্শী ‘সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (২০২৬-২০৪০)’-এ মাসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় অগ্রাধিকারে যুক্ত করা হয়েছে।

আর সদ্য অনুমোদিত ‘জাতীয় পাবলিক টয়লেট নীতি ২০২৬’ দেশের জনসমাগমস্থল ও মহাসড়কগুলোতে নারীবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ওয়াশ পরিকাঠামো নির্মাণের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। কাগজে-কলমে থাকা এই দারুণ সব নীতিমালাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের চারটি জরুরি পদক্ষেপ অবিলম্বে নিতে হবে:

১. ট্যাক্স বা শুল্কমুক্ত করা

জাতীয় ‘এমএইচএম প্ল্যাটফর্ম’-এর দীর্ঘদিনের দাবি মেনে স্যানিটারি প্যাড ও প্রজনন স্বাস্থ্যসামগ্রী তৈরিতে স্থানীয় উৎপাদকেরা যে কাঁচামাল আমদানি করেন, তার ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। পিরিয়ডের পণ্যকে 'লাক্সারি' বা বিলাসদ্রব্য ভাবার মানসিকতা ভুলে একে অতি-জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বা সামগ্রী হিসেবে ঘোষণা করতে হবে, যাতে ৫-১০ টাকার প্যাড সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আসে।

২. তিন বছরের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন

এমএইচএম প্ল্যাটফর্ম ও স্থানীয় সরকার বিভাগের যৌথ উদ্যোগে যে ‘তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা’ নকশা করা হয়েছে, তা দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে নামতে হবে। বাজেট শুধু বরাদ্দে না রেখে, তা প্রতিটি স্কুলের টয়লেটে রানিং ওয়াটার ও সাবানের জোগানে দিতে হবে।

৩. প্রযুক্তির আলো ছড়ানো

কিশোরী ও নারীদের সঠিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য পৌঁছে দিতে এমএইচএম প্ল্যাটফর্মের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চ্যাটবট সমৃদ্ধ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ‘অনন্যা’-কে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। এর মাধ্যমে ঘরের ভেতরে বসেই যেকোনও মেয়ে সম্পূর্ণ গোপনে, বিনা সংকোচে তার প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেকোনও প্রশ্ন বাংলায় জিজ্ঞেস করে সঠিক উত্তর জেনে নিতে পারবে।

৪. বেসরকারি খাত ও সিএসও’র অংশগ্রহণ

বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্যাড উৎপাদনে। আর সিএসও বা সামাজিক সংগঠনগুলোকে কাজ করতে হবে সমাজের অন্ধবিশ্বাস ও ট্যাবু ভাঙার জন্য।

উপসংহার: পিরিয়ডের রক্ত জীবনের স্পন্দন

একটি দেশের উন্নয়ন কেবল জিডিপির অঙ্কে মাপা যায় না; তাকে মাপতে হয় তার নারীদের মর্যাদা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার সূচকেও। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে আমাদের আকুল আবেদন—আসুন, আমরা মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে জাতীয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মূল ধারায় আরও শক্তভাবে যুক্ত করি। মাননীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা, আপনারা নিজ নিজ এলাকার প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি করে কার্যকর ও নিরাপদ নারী ও কিশোরীবান্ধব টয়লেট নিশ্চিত করার বিষয়টিকে ব্যক্তিগত এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করুন।

পিরিয়ডের রক্ত কোনও অপবিত্রতা নয়, তা তো জীবনেরই স্পন্দন। আসুন, সব সংশয় আর অবহেলার শৃঙ্খল ভেঙে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে কোনও নারী বা কিশোরীকে তার জীবনের স্বাভাবিক নিয়মের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলতে হবে না। নীতিমালার খাতা থেকে সিদ্ধান্তগুলো নেমে আসুক আমাদের চেনা বাস্তবে।

লেখক: একজন উন্নয়নকর্মী