ইউনিসেফ ও প্রথম আলো আয়োজিত ‘শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় একীভূতকরণ, স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি ও বাজেট বৃদ্ধি জরুরি। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য একীভূত করা জরুরি
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, ‘শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ তিনি ইতিবাচক প্যারেন্টিং ও নিরাপদ পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোরশেদ বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য জন্মের সময় থেকেই শুরু হয়, তাই শুরু থেকেই সঠিক লালন-পালন নিশ্চিত করা জরুরি।’ ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক দেওয়ান মো. ইমদাদুল হক বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে একীভূত করা জরুরি।’
স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি জোরদার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আসিফ ইকবাল বলেন, ‘স্কুল হেলথ ক্লিনিকের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব।’ সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, ‘১০৯৮ চাইল্ড হেল্পলাইনে ২০২৫ সালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চেয়ে কল এসেছে ১০ হাজার ৪০টি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জাতীয় পেশাদার কর্মকর্তা হাসিনা মমতাজ বলেন, ‘স্কুলভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে উদ্যোগ চলছে।’
বাজেট ও জনবল বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, যা অপ্রতুল।’ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সদস্যসচিব ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘জনবল, অবকাঠামো ও বাজেটের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ।’ ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাবরিনা রাফি বলেন, ‘প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে প্রায় ২৩ ডলার পর্যন্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফেরত পাওয়া যায়।’
সমন্বিত কাঠামো ও কার্যকর পরিকল্পনা
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. সিফাত-ই-সাইদ বলেন, ‘বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর হচ্ছে না।’ আইসিডিডিআরবির সহযোগী প্রকল্প সমন্বয়ক মোহাম্মদ সোহেল শমীক বলেন, ‘অনলাইন সেবা একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।’ মনের বন্ধুর প্রতিষ্ঠাতা তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘অনলাইন হেল্পলাইনে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কল আসে।’
সুপারিশ
বৈঠকে শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাতে অন্তর্ভুক্ত করা, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর একীভূতকরণ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ফ্রন্টলাইন কর্মীদের প্রশিক্ষণ, স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা, পাঠ্যক্রমে জীবনদক্ষতা ও সামাজিক-আবেগপ্রবণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, ইতিবাচক প্যারেন্টিং কার্যক্রম চালু করা, বুলিং ও সাইবার বুলিংবিরোধী জাতীয় কর্মসূচি জোরদার করা, অনলাইন হেল্পলাইন ও টেলি-মেন্টাল হেলথ সেবা সম্প্রসারণ, জাতীয় তথ্যভান্ডার ও নিয়মিত জরিপ ব্যবস্থা চালু, ব্যয়-নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি, মানসিক স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি ও শিশু-কিশোর অংশ নির্ধারণ, বিশেষজ্ঞ জনবল বাড়ানো, রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, গণমাধ্যমে আত্মহত্যা সংবেদনশীল উপস্থাপন, জন্মের শুরু থেকেই মানসিক বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরিবার-স্কুল-কমিউনিটিতে সমন্বিত প্রতিরোধমূলক কাজ চালুর সুপারিশ করা হয়।



