সুনামগঞ্জের হাওরে এখন থই থই পানি। সেই পানির নিচে এখনো ডুবে আছে কিছু কৃষকের ধান। অনেকেই ফসল উদ্ধারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে কেউ কেউ রোদ উঠতেই পানির নিচ থেকে পচা ধান তোলার চেষ্টা করছেন—এতে যদি কিছু ধান ঘরে তোলা যায়। স্থানীয় ভাষায় পানির নিচে ডুব দিয়ে বিশেষ কায়দায় নৌকায় ধান তোলাকে বলা হয় ‘আকি’ দেওয়া।
পচা ধান তোলার দৃশ্য
গতকাল রোববার বিকেলে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের মদনপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানির নিচ থেকে তোলা ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত ১০-১২ জন কিষান-কিষানি। সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পাশে ভেজা ধান এনে সেখানেই ছিটা ছাড়ানো ও খড় আলাদা করা হচ্ছিল। ধান থেকে ইতিমধ্যে পচা গন্ধ আসতে শুরু করেছে।
কৃষকদের ভাষ্য
কৃষকেরা জানান, এসব ধান ১৫ থেকে ২০ দিন পানির নিচে ছিল। ফলে খড় আর কোনো কাজে লাগবে না। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে নিড়ানির মতো একটি সরঞ্জাম বানিয়ে সেটি দিয়ে পানির নিচ থেকে টেনে টেনে দলা পাকানো ধান তোলা হয়। সারা দিনে এক বা দুই নৌকা ধান উদ্ধার করা সম্ভব। পরে হাওরপাড়ে এনে গরু দিয়ে মাড়াই করতে হয়। পানির নিচে থাকা পচা ধান মেশিনে মাড়াই করা যায় না। যাঁদের গরু নেই, তাঁরা নিজেরাই পা দিয়ে ধান মাড়াই করেন।
তাঁদের ভাষ্য, এক বিঘা জমি থেকে এভাবে চার থেকে পাঁচ মণ ধান পাওয়া যায়। তবে নৌকা না থাকলে বা সম্ভাব্য ফলন খুব কম হলে অনেকেই আর ধান তোলার চেষ্টা করেন না। পানির নিচের ধান শ্রমিক দিয়ে কাটানো লাভজনক নয়। আবার টাকা দিলেও অনেক শ্রমিক এ কাজে যেতে চান না। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকলে শরীর চুলকায়। পানিতেও পচা ধানের গন্ধ থাকে।
কৃষক নূর মিয়ার কষ্ট
গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক নূর মিয়া (৭৫) রোদের মধ্যে হাওর থেকে আনা ধান শুকানোর চেষ্টা করছিলেন। পরে সেগুলো মাড়াই করবেন। তিনি বলেন, তাঁর ১৮ বিঘা জমিতে বোরো ধান ছিল। এর মধ্যে ১১ বিঘার ধান তলিয়ে গেছে। বাকি জমি থেকে কোনোমতে ৪৫ মণ ধান তুলেছেন।
নূর মিয়া বলেন, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে তাঁর জমির ধান তলিয়ে যায়। তখন কাটা ধান রক্ষার চেষ্টায় জমিতে থাকা ধান কাটতে পারেননি, শ্রমিকও পাওয়া যায়নি। এখন তিনি ও গ্রামের আরেক কৃষক শফিকুন্নুর মিলে একটি ছোট নৌকা কিনে পানির নিচ থেকে ধান তোলার চেষ্টা করছেন।
শফিকুন্নুর বলেন, ‘এখন তো আর কোনো কামকাজ নাই। এর লাগি চেষ্টা করা। ইতা ধানে তেমন ফায়দা নাই। চার আনাও ঠিকে (টিকে) না।’
নূর মিয়ার পরিবারে সদস্য নয়জন। কৃষিকাজ আর বোরো ধানই তাঁদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তিনি বলেন, ‘যা ক্ষতি অওয়ার অইগিছে। ইবার অনেক কৃষক ঈদ করছে না। ঘরত অভাব। অখন যে ধান তুললাম, ইতা মনের সান্ত্বনা। ইতা হিসাবের না।’ কথার ফাঁকে পাশের এক কৃষকের দিকে ইঙ্গিত করে নূর মিয়া বলেন, ‘তাইনের কাছে যাইন। ৪০ কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমির ধান গেছে। খেতে পইড়া তাইন কানছইন।’
খোয়াজ আলীর দুর্ভোগ
পাশে গিয়ে কথা হয় কৃষক খোয়াজ আলীর (৮২) সঙ্গে। রোদের মধ্যে পচা খড় নেড়ে তা থেকে ভেজা ধান বের করছিলেন। তিনি জানান, প্রথমে জলাবদ্ধতায় কিছু জমির ধান ডুবেছে। এরপর কিছু জমির ধান কেটেছেন। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে মাড়াই করা যায়নি, খলাতে স্তূপে সেই ধান নষ্ট হয়েছে। এরপর আসে উজানের ঢল, সব জমি পানির নিচে চলে যায়। এবার অনেক কৃষক ধান কাটা, মাড়াই করার পরও গোলায় তুলতে পারেননি।
খোয়াজ আলীর ভাষ্য, ‘ইবারের মতো দুর্ভোগ হাওরে আগে কুনো সময় অইছে না। ধান নাই, মানও নাই। আমরার একটা ঈদ নিরানন্দে গেল। আমরার কষ্ট অন্যরা বুঝত না।’
একইভাবে ‘নিরানন্দে’ ঈদ কাটানোর কথা জানান পাশে থাকা গোবিন্দপুরের কৃষক ফয়জুন্নুর, রাহিনুর, কিষানি সাবিকুন নাহার।
হাওরে ধান কাটা ৯০ শতাংশের বেশি
জেলার কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টন। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর এবং হাওরের বাইরের (নন–হাওর) এলাকায় ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ মে পর্যন্ত জেলায় ২ লাখ ২ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা মোট আবাদের ৯০ দশমিক ৫০ শতাংশ। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে কাটা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৯ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৫৩ হাজার ৭৯৬ হেক্টর।
কৃষি বিভাগ গত ৭ মে পর্যন্ত অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছিল। এরপর আর কোনো হালনাগাদ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, চলতি মৌসুমে হাওরে ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার। তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এখনো চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণ করা হয়নি।
সুনামগঞ্জে মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পরে গত ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া অতিভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রায় সব হাওরেই কমবেশি বোরো ধানের জমি তলিয়ে যায়। কয়েক দিন ধরে বৈরী আবহাওয়া থাকায় কৃষকেরা মাঠে নামতে পারেননি। পানির কারণে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহারেও সমস্যা হয়। একই সঙ্গে ছিল তীব্র শ্রমিকসংকট। ফলে অনেক কৃষক চোখের সামনে জমির ধান ডুবে যেতে দেখেছেন। আবার রোদ না থাকায় মাড়াই করা ধানেরও একটি অংশ খলায় নষ্ট হয়েছে।



