হামের টিকা সংকট: শিশুমৃত্যুর সত্য উদঘাটনের দাবি
হামের টিকা সংকট: শিশুমৃত্যুর সত্য উদঘাটনের দাবি

হাম কোনো অচেনা রোগ নয়, এটি টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিশু টিকাদান কর্মসূচির জন্য পরিচিত, কিন্তু সম্প্রতি হামে শত শত শিশুর মৃত্যু প্রশ্ন তুলেছে: এই শিশুরা কেন সুরক্ষা পেল না?

প্রাদুর্ভাবের পরিসংখ্যান

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৩ এপ্রিল জানায়, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়, যার মধ্যে ২ হাজার ৯৭৩ জন নিশ্চিত। এ সময়ে ১৬৬টি সন্দেহভাজন ও ৩০টি নিশ্চিত মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে ৬৪ জেলার ৫৮টিতে এবং সব বিভাগে। আক্রান্তদের বেশিরভাগ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

২০ মে নাগাদ নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যু দাঁড়ায় ৪৮১-এ, যার মধ্যে ৮০টি নিশ্চিত ও ৪০১টি সন্দেহভাজন। নিশ্চিত রোগী ৮ হাজার ৬৭ ও সন্দেহভাজন ৫৭ হাজার ৮৫৬।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

টিকা ঘাটতির কারণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের আওতা কমে যাওয়া, ২০২৪-২৫ সালে টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া প্রাদুর্ভাবের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

পূর্ববর্তী সরকারগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। শহরের বস্তি, দুর্গম এলাকা ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কাছে সেবা পৌঁছানো না গেলে তা ব্যবস্থাগত দুর্বলতা। জনস্বাস্থ্যের অর্জন ধরে রাখতে প্রতিদিন কাজ করতে হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা

টিকার ঘাটতি ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিলম্ব সরাসরি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সঙ্গে যুক্ত। ১ এপ্রিল প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাতিল করা হয়, যা টিকা কেনার পথ বন্ধ করে দেয়। পরে ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে সরাসরি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্তে ফিরে আসা হয়। এই আসা-যাওয়ায় কয়েক মাস নষ্ট হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনলে ১৭.৫ শতাংশ অতিরিক্ত খরচ হয়, যার মধ্যে ১২ শতাংশ পরিবহন ও ৫.৫ শতাংশ সেবা ফি। তবে ইউনিসেফের তথ্যমতে, স্বল্পোন্নত দেশের জন্য হ্যান্ডেলিং ফি ৪ শতাংশ। এই হিসাবের পূর্ণ ব্যাখ্যা দরকার।

ইউনিসেফের সতর্কতা

ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা সরকারকে ৫-৬টি চিঠি ও ১০টি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে টিকার ঘাটতি নিয়ে সতর্ক করেন। ১০ ফেব্রুয়ারির চিঠিটি ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় ধারাবাহিক সতর্কতার অংশ।

এই বক্তব্য গুরুতর, তবে চিঠির তারিখ, প্রাপক ও বিষয়বস্তু প্রকাশ করা দরকার। সরকারের পক্ষে সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, টিকা ক্রয়ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং ইউনিসেফের মাধ্যমে সংগ্রহ বন্ধ হয়নি।

স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা

দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় পার্থক্য। একদিকে ইউনিসেফ সতর্কবার্তা ও ক্রয়সিদ্ধান্তে দেরির কথা বলছে, অন্যদিকে সরকারি পক্ষ ক্রয়ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকার কথা বলছে। এই বিরোধ নথি দিয়ে মেটাতে হবে। একটি স্বাধীন তদন্তে দেখতে হবে: কখন টিকার মজুত নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমে যায়, কে তা জানত, কোন চিঠি কবে পাঠানো হয়েছিল, কোন বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল, অর্থ ছাড়ে দেরি হয়েছিল কি না, সরাসরি ও ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্রয়ের তুলনামূলক খরচ কত ছিল।

হাম শুধু রোগের কথা মনে করিয়ে দেয়নি, এটি দেখিয়েছে জনস্বাস্থ্যে দেরি মানে মৃত্যু। একটি চিঠি দেরিতে পড়া, একটি ফাইল দেরিতে সরানো, একটি ক্রয়াদেশ দেরিতে দেওয়া—এসব প্রশাসনিক ঘটনা কাগজে ছোট মনে হলেও বাস্তবে মূল্য দিতে হয় শিশুদের জীবন দিয়ে।

যে শিশুরা মারা গেছে, তাদের আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু সত্য জানা গেলে ভবিষ্যতের শিশুদের বাঁচানো যাবে। সেই সত্য জানার অধিকার বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের আছে।

ড. আবু মোহাম্মদ শাকিল ফয়জুল্লাহ, জনসংযোগ গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র।