বাংলাদেশে গ্রীষ্মের তীব্রতা দিন দিন বেড়েই চলেছে, তবে বিশেষজ্ঞরা এখন এক নতুন ও মারাত্মক বিপদের কথা বলছেন। তাদের মতে, দুপুরের চড়া রোদের চেয়েও রাতের অতিরিক্ত তাপমাত্রা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের উত্তাপ সূর্যাস্তের পর সাধারণত কমে আসার কথা থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে রাতেও বাতাসে ছটফটানি আর গুমোট ভাব থেকে যাচ্ছে। ফলে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে মানুষের শরীর ঠান্ডা হওয়ার বা নিজেকে সামলে নেওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না।
কেন রাতের তাপমাত্রা বাড়ছে?
জলবায়ু বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বেশ কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে দিনের চেয়ে রাতের তাপমাত্রা দ্রুত গতিতে বাড়ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কংক্রিটের দালানকোঠা, জলাশয় ভরাট এবং গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে 'আরবান হিট আইল্যান্ড' (শহুরে তাপদ্বীপ) তৈরি হচ্ছে। ইট-কংক্রিট সারাদিন যে তাপ শুষে নেয়, তা রাতের বেলা ধীরে ধীরে বাতাসে ছাড়ে। ফলে টিনের ঘর বা কম বাতাস চলাচলের ঘরে থাকা লাখ লাখ মানুষ রাতে এক চরম অস্বস্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে ঘুমাতে বাধ্য হচ্ছেন।
শরীরের ওপর প্রভাব
চিকিৎসক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রাতভর এ অতিরিক্ত গরমের কারণে মানুষের শরীরে পানিশূন্যতা বাড়ে, হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। এর ফলে হিট স্ট্রোক, স্ট্রোক, কিডনির জটিলতা এবং এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, শিশু, গর্ভবতী নারী, দিনমজুর এবং যারা আগে থেকেই বিভিন্ন ক্রনিক (দীর্ঘমেয়াদী) রোগে ভুগছেন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ঘুমের ব্যাঘাত
ঘুমানোর ঠিক আগে মানুষের শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে আসে। কিন্তু চারপাশের পরিবেশ অতিরিক্ত গরম থাকলে এ প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সহজে ঘুম আসতে চায় না এবং বারবার ঘুম ভেঙে যায়। গভীর ঘুমের অভাব হলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে এবং মানসিক চাপ বাড়ে।
হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ
শরীর ঠান্ডা করতে রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয় এবং চামড়ার দিকে রক্ত প্রবাহ বেড়ে যায়, যা হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি কাজের চাপ সৃষ্টি করে। একটি ইউরোপীয় গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরম রাতের কারণে বিশেষ করে প্রবীণ ও নারীদের স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
ঝুঁকিতে যারা
- প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তি
- নবজাতক ও শিশু
- গর্ভবতী নারী
- তীব্র রোদে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ (যেমন: রিকশাচালক, দিনমজুর)
- অপরিসর ও টিনের ঘরে বসবাসকারী নিম্নবিত্ত মানুষ
করতে হবে কী?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদী কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
- পর্যাপ্ত পানি পান: সারাদিনের পাশাপাশি সন্ধ্যার পর থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত নিয়মিত পানি ও তরল খাবার খেতে হবে।
- বাতাস চলাচল: ঘরে যাতে পর্যাপ্ত বাতাস ঢুকতে ও বের হতে পারে (ক্রস-ভেন্টিলেশন) সে ব্যবস্থা রাখুন। সম্ভব হলে ফ্যান ব্যবহার করুন।
- ঘুমানোর আগে গোসল: রাতে শুতে যাওয়ার আগে ঠান্ডা পানিতে গোসল করে নিলে শরীর কিছুটা আরাম পায়।
- পোশাক নির্বাচন: রাতে হালকা এবং সুতি কাপড়ের ঢিলেঢালা পোশাক পরা উচিত।
- ভারী খাবার বর্জন: রাতে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ভারী খাবার এবং ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন।
- দিনের বেলা ঘর ঠান্ডা রাখা: দিনের বেলা ঘরের জানালা ও পর্দা বন্ধ রাখুন যাতে বাইরের রোদ সরাসরি ঘরে এসে ঘরকে গরম করতে না পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের বেলার তাপপ্রবাহ নিয়ে আমরা যতটা সচেতন, রাতের এ নীরব ঘাতক গরম নিয়ে ততটা ভাবছি না। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের এ সময়ে রাতের গরমকে কেবল 'অস্বস্তি' না ভেবে একটি বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা এবং সেই অনুযায়ী সতর্ক হওয়া এখন সময়ের দাবি।



