হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু: মায়ের কান্নায় ফুঁসে উঠলেন অভিযোগ
“শুরুতেই যদি ডাক্তাররা আমার ছেলের চিকিৎসাটা গুরুত্ব দিয়ে করত, তাহলে আমার ছেলেটা আজ বেঁচে থাকত। ডাক্তারদের অবহেলার কারণেই আমরা তাকে হারিয়েছি। আমার সঙ্গে যেমন হয়েছে, তেমন আর কোনও মায়ের সঙ্গে যেন না হয়।” কথাগুলো বলছিলেন হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৯ মাস বয়সী আব্দুর রায়হান মাহাদীর মা মিলি। সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়া এই মা বলেন, “আমার ছেলেটা এক পা, দুই পা করে হাঁটতে শুরু করেছিল। ‘মামমা’ বলে ডাকত। এখন সবই শুধু স্মৃতি। এখন আর কেউ আমাকে ‘মামমা’ বলে ডাকে না। কবরের পাশে দাঁড়িয়েও কোনও শব্দ আসে না।”
মায়ের স্মৃতিচারণায় ফুটে উঠেছে বেদনার গল্প
তিনি আরও বলেন, “এখনও মনে হয় আমার ছেলে পাশে ঘুমিয়ে আছে। সকাল হলে মনে হয় নাস্তা বানাবো, দুপুরে কী খাবে ভাবি, বিকালে ঘুম পাড়াবো। তারপরই মনে হয়—আমার কলিজার টুকরো তো আর নেই। সে অনেক দূরে ঘুমিয়ে আছে… আর কোনোদিন ফিরবে না।” পাবনায় জন্ম হলেও বাবার প্রবাস জীবনের কারণে মাহাদী মায়ের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে নানাবাড়িতে থাকত। ঈদের দুই দিন পর থেকেই তার জ্বর, আমাশয় ও ডায়রিয়া শুরু হয়। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ দেওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক জানান, শিশুটি হাম আক্রান্ত এবং ভর্তি করতে হবে।
চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ
মাহাদীর মায়ের অভিযোগ, ভর্তি হওয়ার পর থেকেই চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল। তিনি বলেন, “ডাক্তার বলেছিল মুখে ঘা হয়েছে, স্যালাইন দিতে হবে। কিন্তু নার্সরা দিত না। সারাদিন বলার পর একবার দিত। বেশি দিলে নিউমোনিয়া হবে—এমন অজুহাত দিত। ডাকলেও কেউ আসত না।” তৃতীয় দিন থেকে অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক রেজাউল করিম শিশুটিকে সরাসরি না দেখার অভিযোগও করেন তিনি। “বারবার বলেছি জ্বর কমছে না, শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধু আগের ওষুধ চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে,” বলেন মিলি।
তিনি আরও জানান, শ্বাসকষ্ট বাড়লেও সময়মতো অক্সিজেন দেওয়া হয়নি এবং রেফার করতে দেরি করা হয়েছে। পরে অবস্থা গুরুতর হলে রাজশাহী, সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মাহাদীর মৃত্যু হয়। সন্তান হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিলি বলেন, “আমার হাজব্যান্ড বিদেশে থাকে, আমি একাই ওদের বড় করতাম। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে পড়াশোনা করাবো। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।”
ঈদের স্মৃতি ও পরিবারের শোক
ঈদের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “ঈদের আগের রাতে সবাই মেহেদি দিচ্ছিল, আমার ছেলেও দিয়েছিল। বাবাকে ভিডিও কলে হাত দেখিয়ে বলেছিল—বাবা আমি সুন্দর করেছি।” মাহাদীর খালা জুলি বলেন, “সে ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান। ঈদের জন্য চার জোড়া স্যান্ডেল কিনেছিলাম, সব এখন পড়ে আছে। এখন আর কার জন্য কিছু কিনবো বুঝি না।” তিনি বলেন, “ঘরে তার স্মৃতি চারদিকে ছড়িয়ে আছে। ডাক্তার-নার্সদের অবহেলার কারণেই আমরা তাকে হারিয়েছি।”
হাসপাতালের বক্তব্য: অভিযোগ অস্বীকার
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. রেজাউল করিম বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি থাকে এবং হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি। তিনি বলেন, “অবহেলার অভিযোগ সঠিক নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন, জ্বর নিয়ন্ত্রণ ও সাপোর্টিভ চিকিৎসা দেওয়া হয়।” তিনি আরও বলেন, গুরুতর রোগীদের রাজশাহীতে রেফার করা হয়। কোনও অভিযোগ থাকলে পরিবার লিখিতভাবে জানাতে পারে।



