২০২৩ সালে ভারতে ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের বিপক্ষে স্মরণীয় ১৭৪ রানের ইনিংস খেলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ওপেনার কুইন্টন ডি কক। মুম্বাইয়ের তীব্র গরমের মধ্যেই তার এই ব্যাটিং পারফরম্যান্সে ভর করেই ১৪৯ রানের বিশাল জয় পেয়েছে প্রোটিয়া দল। বাংলাদেশের ইনিংসের সময় দেখা গেছে, উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতে দাঁড়াননি তিনি। তার জায়গায় কিপিংয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন হাইনরিখ ক্লাসেন। পরে জানা গেছে, মুম্বাইয়ের তীব্র গরমে হালকা ক্র্যাম্প করেছিল তার।
আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপে তাপমাত্রার প্রভাব
এই মাসে শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের উন্মাদনাময় আয়োজন ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো এবারের আয়োজক। বিজ্ঞানিদের মতে, টুর্নামেন্টের জন্য নির্ধারিত ১৬টি স্টেডিয়ামের মধ্যে ১৪টিতেই ফুটবলারদের চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের ম্যাচগুলোতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপেও পড়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানিরা। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রার কারণে খেলার গতি কমতে পারে এবং প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স হ্রাস করবে। ক্লাইমেট সেন্ট্রাল তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন তথ্য প্রকাশ করেছে।
ক্লাইমেট সেন্ট্রাল হলো একটি স্বাধীন অলাভজনক বিজ্ঞান ও গবেষণা সংস্থা, যা জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাব— যেমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে গবেষণা করে। বিজ্ঞানী ও সাংবাদিকদের নিয়ে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বৈজ্ঞানিক তথ্য সহজভাবে সবার কাছে উপস্থাপন করে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ ও প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন সুস্পষ্ট। বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দিন চরম গরম সহ্য করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ও আশেপাশের অঞ্চলে অধিক গরমের দিনের সংখ্যা আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনের প্রধান কারণগুলো হলো— গ্রিনহাউস গ্যাস, শহরাঞ্চলের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গাছপালা ও জলাভূমি ধ্বংস এবং এল নিনো। জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থা আগামী মাসগুলোতে এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি খেলার গতি হ্রাস করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপের ম্যাচে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স হ্রাস করতে পারে। ক্লাইমেট সেন্ট্রাল উদ্ভাবন করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন তাপের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে— যা ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৯৭টিতে খেলোয়াড়দের গতি ধীর করতে পারে, যা খেলার গতি এবং খেলা দেখতে আসা ভক্তদের সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
গবেষণার ফলাফল
ক্লাইমেট সেন্ট্রাল বিশ্লেষণ অনুসারে জলবায়ু পরিবর্তন আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপের সময় তাপের প্রভাবে পারফরম্যান্স-ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৮২ দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) ছাড়িয়ে যাওয়া তাপমাত্রার প্রতিকূলতা পরীক্ষা করে, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন যে, ১০৪টি নির্ধারিত ম্যাচের মধ্যে ৯৭টি এখন এই অবস্থার মুখোমুখি হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে গবেষণায় দেখা গেছে, ৮২ দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে তাপমাত্রা স্প্রিন্ট ফ্রিকোয়েন্সি, মোট দূরত্ব এবং রিকভারি সময় হ্রাস করতে পারে, যা কেবল খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স এবং সুরক্ষাই নয়, ম্যাচ টেম্পো, কৌশল এবং সামগ্রিক খেলার স্টাইলকেও প্রভাবিত করে।
গবেষণার তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নির্ধারিত ১০৪ টি ম্যাচের মধ্যে ৯৭টি পারফরম্যান্স বিমুখী তাপ অনুভব করার সম্ভাবনা বেশি। প্রায় অর্ধেক ম্যাচে তাপ অনুভব করার কমপক্ষে ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যা পারফরম্যান্সকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর মধ্যে ২৬ টি ম্যাচে, জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাবনা কমপক্ষে ১০ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি করে।
এছাড়া সমস্ত ম্যাচের মধ্যে, জলবায়ু পরিবর্তন উরুগুয়ে এবং স্পেনের মধ্যে গুয়াদালাজারায় অনুষ্ঠেয় ২৬ জুনের ম্যাচের সময় পারফরম্যান্স-বিমুখ উত্তাপের সম্ভাবনাকে সবচেয়ে বেশি বাড়িয়ে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই ম্যাচের সময় এই ধরনের তাপের ৭০ শতাংশ সম্ভাবনা আছে।
ফাইনাল ম্যাচের সম্ভাবনা
বিজ্ঞানিরা বলছেন, আমরা এখনও জানি না— কোন দুটি দল আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নির্ধারিত ফাইনাল ম্যাচে অংশ নেবে। তবে আমরা জানি, যে দলগুলো অগ্রসর হবে তারা পারফরম্যান্স প্রতিবন্ধক তাপের ৪৭ শতাংশ সম্ভাবনার মুখোমুখি হবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে— যা প্রায় আগের তুলনায় ১৭ পয়েন্ট বেড়েছে।
খেলোয়াড় ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
নরওয়ের জাতীয় দলের খেলোয়াড় মর্টেন থর্সবি বলেছেন, এই বিশ্লেষণটি পরিষ্কার করে দেয়, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কেবল খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের জন্য একটি গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকিই নয়, তবে তারা খেলার মানকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। যখন তাপ স্প্রিন্টিং, রিকভারি টাইম এবং সামগ্রিক তীব্রতাকে প্রভাবিত করে, তখন এটি ফুটবল খেলার পদ্ধতিটি পরিবর্তন করে এবং সেটি ভালো নয়। ঠিক এ কারণেই আমি গত সপ্তাহে ফিফার কাছে খেলোয়াড়দের চিঠিতে স্বাক্ষর করেছি। আমাদের এই ঝুঁকিগুলো গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে, আমরা যে খেলাটি পছন্দ করি তা মাঠে যারা এবং বিশ্বজুড়ে দেখছেন, তাদের উভয়ের জন্যই সুরক্ষিত রয়েছে।
পরিবেশগত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রফেসর মাইক টিপটন জানান, ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় খেলা মূল খেলাটিকে পরিবর্তন করে, খেলার কৌশল, গতি এবং সামগ্রিক মানকে প্রভাবিত করে। আমরা তীব্রতা হ্রাস, কম স্প্রিন্টিং এবং কম সম্ভাবনা তৈরি হতে দেখছি। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে। দীর্ঘায়িত এক্সপোজার এবং ডিহাইড্রেশন তাপ ক্লান্তি বা এমনকি হিট স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
ক্লাইমেট সেন্ট্রালের আবহাওয়াবিদ শেল উইঙ্কেলি বলেছেন, “অতীতের বিশ্বকাপ আর হবে না, খেলোয়াড়রা বদলে গেছে বলে নয়, বরং পৃথিবী বদলেছে। তাপপ্রবাহ, অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া এবং পরিবর্তনশীল ঋতুগুলো আমাদের পছন্দসই খেলাগুলোর নিয়ম পুনরায় লিখছে। অ্যাথলেটরা আরও সতর্কতার সঙ্গে খেলতে, আলাদাভাবে কৌশল তৈরি করতে এবং ঝুঁকিগুলো ত্যাগ করতে বাধ্য হন— যা একসময় খেলাধুলাকে রোমাঞ্চকর করে তুলেছিল। আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ না করা পর্যন্ত, প্রতিযোগিতায় ভবিষ্যতে কে সবচেয়ে ভালো খেলবে, তা নিয়ে ভাবলে হবে, বরং কে বেশি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে, সেটিই মুখ্য।”
আমেরিকান মেটিওরোলজিকাল সোসাইটির সদস্য জন টুহি-মোরালেস বলেছেন, ফুটবলে একজন সাধারণ মিডফিল্ডার প্রতিটি ম্যাচের জন্য ৬ মাইলের বেশি দৌড়ান। ক্লাইমেট সেন্ট্রালের বিশ্লেষণ দেখায়, কীভাবে এই অভিজাত অ্যাথলেটরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট উষ্ণ তাপমাত্রা সহনশীল হয়ে যাবেন।



