ঢাকার হাসপাতালে ক্যানডিডা অরিস ছত্রাকের বিস্তার: আইসিইউতে নীরব বিপদ
ঢাকার হাসপাতালে ক্যানডিডা অরিস ছত্রাকের বিস্তার

ঢাকার হাসপাতালে ক্যানডিডা অরিস ছত্রাকের বিস্তার: আইসিইউতে নীরব বিপদ

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো মানুষের জীবনকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা আইসিইউ সেই অর্জনের প্রতীক—যেখানে চিকিৎসাপ্রযুক্তি, দক্ষতা ও সেবাশুশ্রূষা মিলে জীবনরক্ষার একটি নিবিড় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কিন্তু কখনো কখনো এই জীবনরক্ষার আশ্রয়স্থলই যদি নতুন বিপদের উৎসে পরিণত হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় আইসিইউতে ‘ক্যানডিডা অরিস' নামক ঔষধ-প্রতিরোধী ছত্রাকের বিস্তার সেইরূপ একটি নীরব কিন্তু গুরুতর বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষণার ফলাফল: উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের প্রায় সাত শতাংশের শরীরে এই ছত্রাকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো—তাদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগী আইসিইউতেই অবস্থানকালে সংক্রমিত হয়েছেন। অর্থাৎ সংক্রমণের একটি বড় অংশ হাসপাতালের অভ্যন্তরেই ছড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে তুলনা করলে পরিস্থিতির গুরুত্ব আরো স্পষ্ট হয়। কানাডা বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উন্নত দেশে এই সংক্রমণের হার সাধারণত শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম, অথচ ঢাকার হাসপাতালসমূহে তা বহু গুণ বেশি।

সুপারবাগের বিপদ: ঔষধ প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ

ক্যানডিডা অরিসকে বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থা ‘সুপারবাগ’ বলে অভিহিত করে। কারণ, এটি সাধারণত ব্যবহৃত অ্যান্টিফাংগাল ঔষধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রায় সব জীবাণুই ফ্লুকোনাজল ও ভরিকোনাজলের মতো প্রচলিত ঔষধে অকার্যকর। ফলে চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য বিপদের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। যেসব রোগী দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকে, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন বা বিভিন্ন ক্যাথেটারের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করে—তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বাড়ে।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

উন্নত বিশ্বে বহুদিন ধরিয়ে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ প্রতিরোধকে একটি স্বতন্ত্র জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশে প্রতিটি বড় হাসপাতালে ‘ইনফেকশন কনট্রোল ইউনিট' কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়। রোগীর সংক্রমণ-ঝুঁকি নির্ণয়, নিয়মিত স্ক্রিনিং, কঠোর পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ—এই চারটি স্তম্ভের উপরই গড়ে উঠেছে সেই ব্যবস্থা। বাংলাদেশেও অবশ্য সংক্রমণ প্রতিরোধের নিয়মাবলি আছে, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘাটতি প্রায়ই চোখে পড়ে। হাসপাতালের ভিড়, সীমিত অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং কখনো কখনো দায়িত্ববোধের অভাব—এই সকল কারণ মিলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

বৃহত্তর সমস্যার প্রতীক: অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স

এখানে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, ক্যানডিডা অরিস কেবল একটি বিচ্ছিন্ন জীবাণু নয়—এটি আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার সামনে উদ্ভূত বৃহত্তর সমস্যার প্রতীক। অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিফাংগাল ঔষধের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে বিশ্ব জুড়ে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স' ক্রমেই বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে। অনেক সময় রোগী কিংবা চিকিৎসক—উভয় পক্ষের অসতর্ক ব্যবহারে জীবাণুগুলি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আজ যা সহজে নিরাময়যোগ্য, কাল তা দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হতে পারে।

সমাধানের পথ: সচেতনতা ও কাঠামোগত পদক্ষেপ

সুতরাং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথম প্রয়োজন সচেতনতা ও শৃঙ্খলা। ক্লোরিনভিত্তিক জীবাণুনাশক দ্বারা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের বাধ্যতামূলক হাত ধোয়ার সংস্কৃতি এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিয়মিত স্ক্রিনিং—এই তিনটি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দ্বিতীয়ত, অ্যান্টিফাংগাল ঔষধ ব্যবহারে সংযম ও যুক্তিসংগত নীতি প্রণয়ন জরুরি। উন্নত দেশগুলিতে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ প্রোগ্রাম' চালু আছে, যার মাধ্যমে ঔষধের ব্যবহার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশেও এই ধরনের কাঠামোগত ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। তৃতীয়ত, গবেষণা ও নজরদারি বিস্তৃত করা প্রয়োজন। ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালের গবেষণা আমাদের সমস্যার একটি অংশমাত্র দেখিয়েছে। কিন্তু দেশের অন্যান্য হাসপাতালেও এই ছত্রাক কতখানি বিস্তার লাভ করেছে, তা জানা এখন সময়ের দাবি। যথাযথ তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতিনির্ধারণ সম্ভব নয়।

বস্তুত, সুপারবাগের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল চিকিৎসকদের দায়িত্ব নয়—এটি একটি সামষ্টিক দায়িত্ব। আমরা যত দ্রুত এর গুরুত্ব অনুধাবন করব, ততই হাসপাতাল আবার নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হবে। অন্যথায়, চিকিৎসার আশ্রয়স্থলেই অদৃশ্য বিপদের বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকবে।