ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত দেশের একমাত্র বিশেষায়িত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। ১৯৫৮ সালে নির্মিত এই হাসপাতালটি শুরুতে ‘সাততলা হাসপাতাল’ নামে পরিচিত ছিল। দেশের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ১৯৬১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হয়। তবে সময়ের ব্যবধানে সংক্রামক রোগ নিরাময়ের এই প্রধান কেন্দ্রটি নিজেই এখন নানা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও তীব্র ব্যবস্থাপনা সংকটে আক্রান্ত।
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও দুর্গন্ধ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সার্বিক চিকিৎসাব্যবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন এলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালটির দিকে যেন কারও নজর নেই। হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশের পরিবেশ চরম অপরিচ্ছন্ন। প্রবেশ করতেই নাকে আসে তীব্র দুর্গন্ধ। এমন এক দমবন্ধকর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হামসহ নানা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা চলছে।
একই ওয়ার্ডে হরেক রোগ: সুস্থ হতে এসে নতুন সংক্রমণ
সরকারি এই বিশেষায়িত হাসপাতালে হাম, এইচআইভি বা এইডস, ডায়রিয়া, বসন্ত (চিকেন পক্স), জলাতঙ্ক, ধনুষ্টংকার, কালাজ্বর, ডেঙ্গু, টাইফয়েড, ডিফথেরিয়া, ম্যালেরিয়া ও অ্যানথ্রাক্সসহ প্রায় সব ধরনের সংক্রামক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া নিউমোনিয়া, জটিল ক্ষত এবং মৌসুমি ভাইরাসজনিত রোগীরাও এখানে আসেন।
বর্তমানে দেশে হামের সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালটিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাও জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। গত ২১ মে সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের তিন, চার, সাত ও আট তলায় হামের রোগীদের চিকিৎসা চলছে। ওয়ার্ড, বারান্দা ও লিফটের সামনাসহ প্রায় সব জায়গায় রোগী ভর্তি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো— একই ওয়ার্ডে হাম, চিকেন পক্স, ধনুষ্টংকারসহ বিভিন্ন রোগের রোগীরা একসঙ্গে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর ফলে এক রোগ নিয়ে এসে রোগীরা অন্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জের আসমা আক্তারের (১১) মা জানান, ১৫ দিন আগে মেয়ের চিকেন পক্স (বসন্ত) হওয়ায় এই হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি যাওয়ার ঠিক চারদিন পরেই মেয়ের আবার হাম হয়। এখন আবারও তাকে এই হাসপাতালে এনে ভর্তি করতে হয়েছে।
শয্যা সংকট ও নোংরা পরিবেশ
১০০ শয্যার এই হাসপাতালে গত ২১ মে ভর্তি ছিলেন ৯৬ জন রোগী। এর মধ্যে হামের রোগীর জন্যই নির্ধারিত শয্যা মাত্র ১৫টি, অথচ ওই দিন হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি ছিল ৫১ জন। এছাড়া এইডসের ১৩ জন, চিকেন পক্সে ১২ জন, জলাতঙ্কে ৩ জন, ধনুষ্টংকারে ১১ জন এবং অন্যান্য জ্বরে আক্রান্ত ৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৮৭৫ জন রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১২৪ জনকে ভর্তি হতে হয়েছে। নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৪০৬ জনের। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অভিভাবকেরা জানান, শয্যা না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। বারান্দায় ফ্যান না থাকায় এক অভিভাবক নিজেই ছোট একটি ফ্যান কিনে এনে ব্যবহার করছেন। হাসপাতালের বিভিন্ন তলা ও ওয়ার্ডে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। অভিযোগ রয়েছে, দিনে মাত্র একবার ঝাড়ু দেওয়া হয়। রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন অবস্থান করায় এবং তারা নির্ধারিত বিনে ময়লা না ফেলে শয্যার পাশে ফেলায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের অধিকাংশের সঙ্গে একাধিক স্বজন অবস্থান করেন। তারা হাসপাতালেই খাওয়া-দাওয়া ও রাতযাপন করেন। হাসপাতাল কর্মীদের অভিযোগ, অনেক স্বজন নির্ধারিত বিন ব্যবহার না করে শয্যার পাশেই ময়লা ফেলেন, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে।
জনবল সংকট ও বস্তির বাস্তবতা
মহাখালীর সাততলা বস্তি এলাকার ভেতরে অবস্থিত হাসপাতালটি অনেকের কাছে কুকুরে কামড়ানোর চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। সারা বছরই এখানে জলাতঙ্কের টিকা নিতে রোগীদের ভিড় থাকে। বৃষ্টি হলে হাসপাতালের সামনে পানি জমে থাকে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও পরিচালক এ এফ এ আসমা খানম বলেন, ‘হাসপাতালে মাত্র ১৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন। এত কম জনবল দিয়ে পুরো হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হচ্ছে না। দুই মাস আগে দায়িত্ব নিয়ে আমি আমার জায়গা থেকে চেষ্টা করলেও পরিবেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা যাচ্ছে না।’
একই ওয়ার্ডে সব রোগী রাখার বিষয়ে তিনি নিরুপায় হয়ে বলেন, ‘আমাদের জায়গা নেই, তাই বাধ্য হয়ে একই সঙ্গে বিভিন্ন রোগের রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, হাসপাতালের ভেতর দিয়েই মহাখালী সাততলা বস্তিবাসীর চলাচলের রাস্তা হওয়ায় দিনরাত মানুষের ভিড় থাকে। আশপাশে বস্তি থাকায় লোকসমাগম বেশি এবং সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালের চত্বরে বহিরাগতদের আড্ডা দিতেও দেখা যায়।
তিন রোগ নিয়ে পরিচালকের গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য বার্তা
জলাতঙ্ক
এ এফ এ আসমা খানম বলেন, ‘কুকুর কামড়ালে আক্রান্ত স্থান দ্রুত ক্ষারযুক্ত পানি বা সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। অনেক সময় পরিবার আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে দেরি করে ফেলে। কিন্তু দ্রুত আক্রান্ত স্থান ধুয়ে ফেললে ভাইরাসের একটি অংশ সেখানেই নষ্ট হয়ে যায়। কুকুর যদি মাথা, ঘাড় বা মুখে কামড় দেয়, তাহলে ভাইরাস দ্রুত মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে যত ভ্যাকসিনই দেওয়া হোক না কেন, রেবিস হলে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় শতভাগ।’
ধনুষ্টংকার
ধনুষ্টংকার রোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মাঠে কাজ করার সময় মরিচাযুক্ত কোনও বস্তুতে আঘাত পাওয়া বা কেটে যাওয়ার কারণে বেশি রোগী আক্রান্ত হন। শরীরের কোনও অংশ মরিচাযুক্ত কিছু দিয়ে কেটে গেলে দ্রুত পরিষ্কার করতে হয়। পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব টিআইজি ইনজেকশন নেওয়া ভালো। কিন্তু অনেকেই বিষয়টি অবহেলা করেন। পরে সংক্রমণ তৈরি হয়ে তীব্র জ্বর ও খিঁচুনি দেখা দেয়। খিঁচুনি শুরু হলে ধনুষ্টংকারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।’
তিনি জানান, ছোটবেলায় নেওয়া টিটেনাস টিকার কার্যকারিতা প্রায় ১৫ বছর পর্যন্ত থাকে। এরপর আবার পাঁচ ডোজ টিটেনাস টিকা বা বুস্টার নিতে হয়, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। ১৫ বছরের পর পাঁচ ডোজের মধ্যে অন্তত দুটি ডোজ নেওয়া থাকলে ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। তবে যদি মাত্র একটি ডোজ নেওয়া থাকে, তাহলে আবার পূর্ণ ডোজ নিতে হবে।
এইডস
এইডস রোগীদের বিষয়ে তিনি বলেন, “প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে জ্বর, নিউমোনিয়া বা টিবি দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত রোগীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তাদের খাবারে রুচি থাকে না, জ্বর, ডায়রিয়া ও হজমের সমস্যা হয়। সামান্য ঠান্ডা বা কাশি থেকেও সহজে নিউমোনিয়া হতে পারে। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসও সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখা যায়।” তিনি জানান, বর্তমানে হাসপাতালে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী এইডস রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ১৩ জন রোগী। এছাড়া প্রায় ২ হাজার ৬০০ রোগী হাসপাতাল থেকে নিয়মিত ওষুধ সংগ্রহ করছেন।
‘ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রামক হাসপাতাল চরম ঝুঁকিপূর্ণ’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে এই হাসপাতাল থেকেই উল্টো রোগ সংক্রমণের (ক্রস ইনফেকশন) ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ এম এ বারী বলেন, ‘সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মূল নিয়মই হচ্ছে হাসপাতালটি সম্পূর্ণ ‘আইসোলেটেড’ বা লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। যেখানে ঘনবসতি কম, তেমন জায়গায় এটি নির্মাণ করতে হয়। কারণ সংক্রামক রোগ একজনের শরীর থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়ায়। এই হাসপাতালটি যত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় থাকবে, তত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে। বিশেষ করে আশপাশের শিশু, ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার বা হাঁপানি রোগীদের জন্য এটি মারাত্মক বিপজ্জনক। ঘনবসতিপূর্ণ এমন পরিবেশে চিকিৎসাসেবা কার্যকর হতে পারে না। বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে এবং হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে দ্রুত সরকারের বড় ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন।’



