বাংলাদেশে ৮০ লাখ মানুষ গ্লুকোমাজনিত সমস্যায় ভুগছেন, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করলেন
বাংলাদেশে ৮০ লাখ মানুষ গ্লুকোমাজনিত সমস্যায় ভুগছেন

বাংলাদেশে চোখের গ্লুকোমা রোগে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন মিলিয়ে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ ভুগছেন বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষ্যে রাজধানীর ধামনন্ডিতে বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

গ্লুকোমার ভয়াবহতা ও পরিসংখ্যান

গ্লুকোমা চোখের একটি নীরব ঘাতক রোগ, যা অপটিক স্নায়ুর ক্ষতি করে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস ও অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। সোসাইটির মহাসচিব ডা. শাহনাজ বেগম বলেন, গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং নিয়মিত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

দেশব্যাপী জরিপের ফলাফল

২০২৪ সালের একটি জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশীদের মধ্যে গ্লুকোমার প্রবণতা ৩.২ শতাংশ। এতে আনুমানিক ২০ লাখ মানুষ আক্রান্ত এবং ৬০ লাখ সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে চিহ্নিত। প্রাথমিক ওপেন-এঙ্গেল গ্লুকোমা সবচেয়ে সাধারণ ধরন, যা ৭৮ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় এবং বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি।

আরেকটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ রোগটি সম্পর্কে অজ্ঞাত, ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ঘটছে। গ্লুকোমা বিশ্বব্যাপী স্থায়ী অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ; বর্তমানে বিশ্বে ৮ কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত, যার মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ অন্ধত্বের শিকার। বিশ্বের ৯০ শতাংশ মানুষ গ্লুকোমা সম্পর্কে জানেন না, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে। ২০৪০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রায় ১২ কোটি মানুষ গ্লুকোমায় আক্রান্ত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে অন্ধত্বের কারণ

বাংলাদেশে অন্ধত্বের প্রধান কারণ হিসেবে ছানি প্রথম স্থানে রয়েছে, আর গ্লুকোমা দ্বিতীয় স্থানে। তবে গ্লুকোমা আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি মানুষই জানেন না যে তারা এই রোগে ভুগছেন। উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন:

  • ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তিরা
  • যাদের পরিবারে গ্লুকোমার ইতিহাস রয়েছে
  • ডায়াবেটিস রোগীরা
  • অতিরিক্ত মাইনাস পাওয়ারের চশমা ব্যবহারকারীরা

লক্ষণ ও শনাক্তকরণ

গ্লুকোমা প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ না দেখালেও, অগ্রসর হলে পার্শ্ববর্তী দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, চোখে ব্যথা, লালভাব বা আলোর চারপাশে রংধনু বলয় দেখা যেতে পারে। রোগ শনাক্ত করতে চোখের চাপ পরীক্ষা, অপটিক স্নায়ু পরীক্ষা এবং ফিল্ড টেস্ট করা হয়। চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে চোখে ড্রপ, লেজার থেরাপি বা সার্জারি।

বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহের কর্মসূচি

প্রতি বছর ৮ থেকে ১৪ মার্চ বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ পালন করা হয়। এবছর বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি সারা দেশে সচেতনতামূলক লিফলেট, পোস্টার ও ব্যানার বিতরণসহ নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। গতকাল সকালে ধানমন্ডির হারুন আই ফাউন্ডেশন হাসপাতালে বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির মহাসচিব ডা. মো. জিননুরাইন (নিউটন) সন্দেহভাজন রোগীদের জন্য বিনামূল্যে গ্লুকোমা স্ক্রিনিং ক্যাম্প উদ্বোধন করেন।

এরপর চিকিৎসক ও রোগীদের নিয়ে একটি সচেতনতামূলক র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়। বিকালে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আলোচনা সভা ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম, যিনি গণমাধ্যমকে গ্লুকোমা সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান এবং রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

অন্যান্য বক্তাদের অবদান

প্রধান অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. শাহাবউদ্দিন এবং মহাসচিব ডা. মো. জিননুরাইন (নিউটন) গ্লুকোমার ভয়াবহতা ও চিকিৎসা সম্পর্কে বক্তব্য দেন। অন্যান্যদের মধ্যে বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক এম নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক ডা. মো. মিজানুর রহমান, অধ্যাপক মো. আরিফ মিয়া, ডা. এম জিয়াউল করিম, অধ্যাপক ডা. হাসান শহীদ, অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা সহীদ, বারডেম হাসপাতালের দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. অরুপ রতন চৌধুরী এবং শাহজাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম শাহি আলম গ্লুকোমার বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন।

বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, গ্লুকোমা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত চোখের পরীক্ষার মাধ্যমে অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভব। তারা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগেরও আহ্বান জানান।