অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি: কর্নিয়া সংযোজনে ফিরে পাচ্ছেন দৃষ্টিশক্তি
কর্নিয়া সংযোজনে অন্ধত্ব থেকে মুক্তি, সন্ধানীর ভূমিকা

অন্ধত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ: কর্নিয়া সংযোজনের সফলতা

দুই চোখ অন্ধ হয়ে থাকা মানে এই অপূর্ব পৃথিবীর সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হওয়া। জন্মদাতা পিতামাতা, আপনজনের মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। শুধু কণ্ঠস্বর শুনে, গল্পগুজব আর হাসিঠাট্টার মাধ্যমে প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়। এই মানসিক যন্ত্রণা অন্ধ ব্যক্তিদের নীরবে কুরে কুরে খায়, চোখের পানি ফেলতে বাধ্য করে। সারা বিশ্বে লাখ লাখ অন্ধ নারী-পুরুষ এমন কষ্ট বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে কর্নিয়া সংযোজনের মাধ্যমে অনেকেই আবার পৃথিবীর আলো দেখতে পারছেন।

সন্ধানীর মহৎ উদ্যোগ: ১৯৮৪ সাল থেকে চলমান সেবা

১৯৮৪ সাল থেকে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি অন্ধ মানুষের চোখে কর্নিয়া সংযোজনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার কাজ করে আসছে। শত শত মানুষ এই পদ্ধতির সুবিধা নিয়ে নতুন জীবন পেয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার ময়দাশ্রীনগর গ্রামের বাসিন্দা স্মৃতি (৩২)।

স্মৃতির ফুফু আশা জানান, 'স্মৃতি এখন ভালো আছে, তাকে বিয়েও দেওয়া হয়েছে। দুই চোখে দেখতে পারছে। সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির মাধ্যমে তার চোখে কর্নিয়া সংযোজনের ফলে সে এখন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে।' আশা আরও বলেন, 'আমিসহ পরিবারের সব সদস্য মরণোত্তর চক্ষুদান করে যাব। কয়েক দিন পরই আমরা ঢাকায় সন্ধানীতে গিয়ে অঙ্গীকারনামা দেব।'

স্মৃতির কাহিনী: পঞ্চম শ্রেণি থেকে শুরু হওয়া সমস্যা

স্মৃতি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক চোখে কম দেখতে শুরু করেন। এইচএসসিতে ওঠার পর দুই চোখেই দৃষ্টিশক্তি হারান। এই অবস্থায় পরিবারে হতাশা নেমে আসে। পরে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করে ২০২১ সালে এক চোখে এবং ২০২২ সালে অপর চোখে কর্নিয়া সংযোজন করা হয়। এর ফলে স্মৃতি ফিরে পান নতুন এক আনন্দময় জীবন।

অন্য সফলতা: যশোরের জহিরুল ইসলাম

যশোরের শার্শা উপজেলার বহিলা গ্রামের মো. জহিরুল ইসলাম (২৯) দুই চোখে দেখতে পারতেন না। ২০১০ সালে এক চোখে এবং ২০১২ সালে দ্বিতীয় চোখে কর্নিয়া সংযোজনের মাধ্যমে তিনি এখন দুই চোখেই দেখতে পারছেন। ঢাকিতে চাকরি করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন তিনি।

বাংলাদেশে অন্ধত্বের পরিসংখ্যান

বাংলাদেশে অন্ধত্ব একটি বড় সমস্যা। সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ১৪ লক্ষাধিক মানুষ দৃষ্টিশক্তিহীন। এর মধ্যে লাখের মতো কর্নিয়াজনিত অন্ধ। প্রতি বছর নতুন করে ৪০ হাজার মানুষ অন্ধত্বের শিকার হচ্ছেন।

সন্ধানী ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪৫ হাজার ৯৯ জন মরণোত্তর চক্ষুদানে অঙ্গীকার করেছেন। ৪১৯৬টি কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ৩৫৩৩ জনের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তারা এখন সবাই পৃথিবীর আলো দেখতে পারছেন।

সাম্প্রতিক উদাহরণ: স্মৃতিমান ভিক্ষুর চক্ষুদান

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে স্মৃতিমান ভিক্ষু (৮২) মারা যান। তার পুত্র সন্ধানী আন্তর্জাতিক চক্ষু ব্যাংকে যোগাযোগ করলে একটি টিম গিয়ে তার দুই চোখের কর্নিয়া সংগ্রহ করে। জীবিত থাকাকালে স্মৃতিমান চক্ষুদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। পরদিন সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালের কর্নিয়াল সার্জন ডা. সৈয়দ এ হাসান চাঁদপুরের আশরাফুল ইসলাম নিরব (১৭) ও টাঙ্গাইলের রেশমা আক্তার ইভার (১৭) চোখে এই কর্নিয়া সংযোজন করেন।

সন্ধানীর ইতিহাস ও ভূমিকা

সন্ধানীর মহাসচিব ডা. মনির হোসেন জানান, কর্নিয়া প্রতিস্থাপন অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির একটি কার্যকর উপায়। ১৯৭৯ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একদল ছাত্র ও তাদের বন্ধুবান্ধব সন্ধানী নামের স্বেচ্ছায় রক্তদান প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অধ্যাপক ডা. আব্দুল কাদেরের সহায়তায় প্রথম বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি চালু করে তারা।

সন্ধানী জাতীয় রক্তদান সমিতি ১৯৭৯ সালে এবং জাতীয় চক্ষুদান সমিতি ১৯৮৪ সাল থেকে আর্তমানবতার সেবায় কাজ করছে। সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফজলুল হক কাশেম বলেন, 'মরণোত্তর চক্ষুদানে সবাই সচেতন হলে অন্ধত্ব আর থাকবে না।'

২০০৪ সালে সমাজ সেবায় বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র সংগঠন হিসেবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ পেয়েছে সন্ধানী।