উইলিয়াম হার্ভে: যিনি ভেঙেছিলেন ১৪০০ বছরের চিকিৎসা ভ্রান্তি
উইলিয়াম হার্ভে: রক্তসঞ্চালনের আবিষ্কারক

উইলিয়াম হার্ভে: যিনি ভেঙেছিলেন ১৪০০ বছরের চিকিৎসা ভ্রান্তি

প্রায় চার শ বছর আগে, চিকিৎসাবিজ্ঞান এক অন্ধকার যুগ পার করছিল। রোগীরা জ্বর বা অসুখে ভুগলে চিকিৎসকেরা একটি ভয়ংকর পদ্ধতি অনুসরণ করতেন: ব্লাডলেটিং। ধারালো ছুরি দিয়ে হাত বা পা কেটে রক্ত বের করে দেওয়া হতো, কারণ বিশ্বাস ছিল যে শরীরে জমে থাকা 'খারাপ রক্ত'ই অসুস্থতার মূল কারণ। এই ভুল ধারণাটি প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনের তত্ত্ব থেকে উদ্ভূত হয়েছিল, যা বলত যে যকৃৎ প্রতিনিয়ত নতুন রক্ত তৈরি করে এবং শরীর তা ব্যবহার করে ফেলে। গ্যালেনের এই তত্ত্ব প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছর ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে টিকে ছিল, এমনকি ইবনে সিনার মতো বিজ্ঞানীদের রচনাতেও এর প্রভাব রয়ে গিয়েছিল।

হার্ভের যাত্রা: গণিত ও পর্যবেক্ষণের মেলবন্ধন

১৫৭৮ সালের ১ এপ্রিল ইংল্যান্ডের ফোকস্টোন শহরে জন্মগ্রহণ করেন উইলিয়াম হার্ভে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ইতালির পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যায়ন করতে যান, যা তখন ইউরোপের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সেখানে তিনি গ্যালিলিও গ্যালিলির মতো বিজ্ঞানীর সংস্পর্শে আসেন, যার যৌক্তিক ও পরীক্ষামূলক চিন্তাধারা হার্ভেকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পাদুয়ায় তাঁর অ্যানাটমি শিক্ষক জিরোলামো ফ্যাব্রিচি শিরায় একমুখী কপাটিকা আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু এর প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পারেননি। হার্ভে এই রহস্য উন্মোচনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

রক্তসঞ্চালনের গণিতীয় প্রমাণ

১৬০২ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে হার্ভে সেন্ট বার্থোলোমিউ হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন। গ্যালিলিওর দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে, তিনি প্রথমবারের মতো গণিতকে শারীরবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করেন। গ্যালেনের তত্ত্ব অনুযায়ী, যদি যকৃৎ প্রতিদিন নতুন রক্ত তৈরি করে, তবে হার্ভের হিসাব অনুসারে, হৃৎপিণ্ড প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কেজি রক্ত পাম্প করে, যা খাদ্য থেকে তৈরি করা অসম্ভব। এই গণনা থেকে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে শরীরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্তই আছে, যা হৃৎপিণ্ডের মাধ্যমে একটি বদ্ধ চক্রে ঘুরে বেড়ায়—এটিই রক্তসঞ্চালনের মূলনীতি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যুগান্তকারী আবিষ্কার

হার্ভে শুধু তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি সরল পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর ধারণা প্রমাণ করেন। তিনি একজন মানুষের হাতে টুর্নিকেট বেঁধে দেখান যে শিরার রক্ত শুধু হৃৎপিণ্ডের দিকেই প্রবাহিত হয়, ফ্যাব্রিচির আবিষ্কৃত কপাটিকার কারণে উল্টো দিকে যেতে পারে না। এই পরীক্ষা প্রমাণ করে যে ধমনি দিয়ে রক্ত শরীরে ছড়ায় এবং শিরা দিয়ে তা ফিরে আসে, একটি অবিরাম চক্র তৈরি করে। ১২ বছর ধরে গবেষণার পর, ১৬২৮ সালে তিনি ডি মোটু কর্ডিস বইটি প্রকাশ করেন, যেখানে রক্তসঞ্চালনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি মাইলফলক স্থাপন করে।

বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া ও উত্তরাধিকার

হার্ভের আবিষ্কার শুরুতে ব্যাপক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়; অনেক চিকিৎসক তাঁকে 'পাগল' বা 'হাতুড়ে ডাক্তার' আখ্যা দেন। তবে, ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমস ও প্রথম চার্লসের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তিনি নিরাপদে গবেষণা চালিয়ে যান। হার্ভে ধমনি ও শিরার সংযোগকারী কৈশিক জালিকা দেখে যেতে না পারলেও, তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর ১৬৬১ সালে মার্সেলো মালপিঘি মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে এটি আবিষ্কার করেন, হার্ভের মডেলকে সম্পূর্ণতা দেন। আজ, উইলিয়াম হার্ভেকে আধুনিক শারীরবিদ্যার জনক হিসেবে স্মরণ করা হয়, যাঁর সাহসিকতা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে।