নানার মেঝেতে শোয়ার স্মৃতি নিয়ে রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসক সাব্বির আহমেদ
নানার মেঝেতে শোয়ার স্মৃতি নিয়ে রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসক

নানার মেঝেতে শোয়ার স্মৃতি নিয়ে রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসক সাব্বির আহমেদ

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে আবাসিক চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. সাব্বির আহমেদ। তাঁর এই পেশাগত অবস্থানে পৌঁছানোর পথে রয়েছে এক মর্মস্পর্শী ব্যক্তিগত ইতিহাস। ২০১১ সালের অক্টোবরে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে, সাব্বিরের নানা ওসমান গণি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হন।

হাসপাতালের মেঝেতে কাটানো ১০ দিন

সেই সময় হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে সাব্বিরের নানাকে মেঝেতেই রাখা হয়েছিল। সাব্বির নিজেও নানার পাশে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে কাটিয়েছিলেন দীর্ঘ ১০ দিন। "হাসপাতালের মেঝেতে থাকার ভোগান্তি দিনগুলো চোখে ভেসে ওঠে আমার," বলেন সাব্বির। দুর্ভাগ্যবশত, চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই সাব্বিরের নানা মারা যান, সাব্বিরের চিকিৎসক হওয়া দেখে যেতে পারেননি তিনি।

একই হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে ফিরে আসা

২০২৪ সালের ১৫ এপ্রিল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিউরোসার্জারিতে এমএস কোর্স শুরু করেন সাব্বির। গত সপ্তাহে তিনি ‘ফেজ এ’ পাস করে এখন ‘ফেজ বি’–এর অংশ হিসেবে একই হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালটিতে দায়িত্ব পালনের সময় মেঝেতে রোগী দেখলেই নানার কথা মনে পড়ে বলে জানালেন তিনি।

মেঝেতে রোগীদের প্রতি বিশেষ মমতা

"অনেক মায়া লাগে," বলেন সাব্বির যখন মেঝেতে থাকা রোগীদের দেখেন। "রোগীর পাশে বসে কথা বলার চেষ্টা করি। মনে হয়, কখন এ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। বিছানা খালি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধ করি মেঝেতে থাকা রোগীকে বিছানা দিতে।"

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় মেডিসিন বিভাগের (পুরুষ) মেঝেতেই সাব্বিরের নানা ভর্তি ছিলেন। সাব্বিরের মতে, এই বিভাগের চিত্রের তেমন বদল ঘটেনি। হাসপাতালটি এক হাজার শয্যার হলেও রোগী ভর্তি থাকেন আড়াই হাজারের বেশি। প্রতিদিন জরুরি বিভাগেই প্রায় এক হাজার নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন।

চিকিৎসক হিসেবে তাঁর দর্শন

সাব্বির প্রথম আলোকে বলেন, "চিকিৎসক হিসেবে নিজের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার চেষ্টা করি।" তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের না থামিয়ে তাঁদের কাছ থেকে সমস্যার কথা ধৈর্য ধরে শোনার চেষ্টা করেন।

"চিকিৎসক রোগীকে বাছাই বা পছন্দ করেন না, রোগীই চিকিৎসককে বাছাই করেন," বলেন সাব্বির, চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের এই মৌলিক নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে।

শিক্ষা ও পেশাগত যাত্রা

সাব্বিরের জন্ম লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায়। তাঁর নানা ছিলেন কৃষক। সাব্বিরের বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা রংপুরে। পরে তিনি দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ২০১৯ সালে তিনি গ্রামীণফোনের টেলিমেডিসিন সেবায় কাজ শুরু করেন। করোনা মহামারিকালে আইইডিসিআরের হটলাইন নম্বরে প্রায় ৫০ জন চিকিৎসকের টিম লিডার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে অনারারি মেডিকেল অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন সাব্বির। তিনি নিউরোসার্জারিতে এফসিপিএস করেছেন। ৪২তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ক্যাডার হন তিনি। ২০২২ সালে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁর প্রথম পোস্টিং হয়, যেখানে তিনি দুই বছর কাজ করেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সাব্বিরের স্ত্রী জাহিদা জাহান জেরিনও একজন চিকিৎসক, যিনি বর্তমানে গাইনিতে এফসিপিএস পার্ট–১–এর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই দম্পতির দুই ছেলে রয়েছে। সাব্বির দ্য বাংলাদেশ এএমআর রেসপন্স অ্যালায়েন্সের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন।

২০০৯ সালে স্কুলের সাত বন্ধু মিলে প্রতিষ্ঠা করেন হিউম্যান এফোর্টস ফর লোকাল পিপল নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ভবিষ্যতে নিউরোসার্জারিতে গবেষণা করা এবং ব্যয়বহুল এই চিকিৎসাকে সহজলভ্য করার জন্য কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সাব্বির আহমেদ।