কঙ্কাল চুরি চক্রের নেপথ্যে মেডিকেল শিক্ষার্থী, পুলিশের অভিযানে চারজন গ্রেফতার
কঙ্কাল চুরি চক্রে মেডিকেল শিক্ষার্থী, পুলিশ গ্রেফতার চারজন

কবরস্থানে হানা দিচ্ছে কঙ্কাল চোর চক্র, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জড়িত থাকার অভিযোগ

মানুষের শেষ ঠিকানা কবরস্থানেও আর নিরাপদ নয়। গাজীপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুর জেলার অরক্ষিত কবরস্থানগুলো থেকে কঙ্কাল চুরি করে তা প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছে এক সংঘবদ্ধ চক্র। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই অন্ধকার জগতের নেপথ্যে জড়িয়ে পড়েছে হবু চিকিৎসকদের নাম। রাজধানীর তেজগাঁও ও উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ এমন এক কঙ্কাল চোর চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৪৭টি মানুষের মাথার খুলি এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের হাড়গোড়।

পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। চক্রটি মূলত লাশ দাফনের এক বছর পর, যখন শরীর মাটির সঙ্গে মিশে যায়, তখনই কবরে হানা দিত। যেসব কবরে সিসি ক্যামেরা বা প্রহরীর নজরদারি নেই, সেগুলোই ছিল তাদের প্রাথমিক শিকার। কবর থেকে সংগৃহীত কঙ্কালগুলো মাঠপর্যায় থেকে মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায় কিনে নিত চক্রটি। এরপর রাসায়নিকের মাধ্যমে সেগুলো পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হতো।

গ্রেফতারদের মধ্যে দুই মেডিকেল শিক্ষার্থী

গ্রেফতার হওয়া চারজনের মধ্যে কাজী জহুরুল ইসলাম সৌমিক (২৫) উত্তরার সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। অন্যজন ফয়সাল আহম্মেদ (২৬) একই কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ইন্টার্নশিপের অপেক্ষায় ছিলেন। মূলত মেডিকেল শিক্ষার্থীদের চাহিদাকে পুঁজি করেই তারা এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। গ্রেফতার হওয়া অন্য দুজন হলেন আবুল কালাম (৩৯) ও আসাদুল মুন্সী জসিম এরশাদ (৩২)। এদের মধ্যে আবুল কালামের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের কঙ্কাল চুরির মামলাসহ মোট ২১টি মামলা রয়েছে।

অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে সক্রিয় চক্র

পুলিশ জানায়, এ চক্রটির শেকড় অনেক গভীরে। তাদের একটি অনলাইন ‘হোলসেলিং গ্রুপ’ রয়েছে, যেখানে প্রায় ২০ হাজার সদস্য যুক্ত। এর মধ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে ৭০০ জন কর্মী। ক্রেতা কঙ্কালের ফরমায়েশ দিলে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় নিয়ে তা সরবরাহ করা হতো। তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা গত কয়েক বছর ধরে এই পেশায় জড়িত। তারা কেউ কেউ ইতোমধ্যে ২০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত কঙ্কাল বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি আরও জানান, যদি কোনো ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেন, তবে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে কঙ্কালগুলো শনাক্ত করে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

এই ঘটনা সমাজে নৈতিকতার সংকট ও আইনের শাসনের গুরুত্ব তুলে ধরছে। পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ প্রশংসনীয় হলেও, কবরস্থানের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা প্রদানের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।