রমেক হাসপাতালে অচল যন্ত্রপাতি, চিকিৎসাসেবায় সংকট
রমেক হাসপাতালে অচল যন্ত্রপাতি, সেবায় সংকট

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ রোগনির্ণয় যন্ত্র বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকায় চিকিৎসাসেবায় মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এর ফলে প্রতিদিন হাজারও রোগী কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন।

পরিদর্শনে যা দেখলেন সংসদ সদস্যরা

রোববার সকালে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের নেতৃত্বে জামায়াতের তিন সংসদ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে এমন চিত্র দেখতে পান। তাদের সঙ্গে ছিলেন রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী এবং হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান।

সংসদ সদস্যরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং রোগনির্ণয় যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ কক্ষ ঘুরে দেখেন। এ সময় দেখা যায়, বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক কক্ষেই ধুলোবালি ও ময়লা জমে রয়েছে, কোথাও কোথাও দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, অচল এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ২০টি মেরামতের অযোগ্য। এছাড়া ২টি সিটি স্ক্যান, ২টি এমআরআই এবং ৮টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও মেরামতযোগ্য নয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রোগীদের দুর্ভোগ

পরিদর্শনকালে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রায়ই তাদের হাসপাতালের বাইরে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে। পীরগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন বকুল মিয়া বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি সব পরীক্ষা বাইরে করতে হয়, তাহলে গরিব মানুষের জন্য এই হাসপাতালের সুবিধা কোথায়? একটি সিটি স্ক্যান করাতেই কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দিনাজপুর থেকে আসা এক রোগী বলেন, ‘চিকিৎসক পরীক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু হাসপাতালে মেশিন সচল না থাকায় বাইরে যেতে বলা হয়েছে। অনেকেই টাকা জোগাড় করতে না পেরে পরীক্ষা করাতেই পারছেন না।’ আরেক রোগীর অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, ‘হাসপাতালে জনবল কম থাকায় রোগীদের নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এই সুযোগে কিছু অসাধু দালাল রোগীদের বিভ্রান্ত করে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।’

সংসদ সদস্যদের বক্তব্য

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বেলাল। তিনি বলেন, ‘রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরবঙ্গের আট জেলার মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি সংকট, অব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় তদারকির অভাবে হাসপাতালের সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে অনেক মেশিন সঠিকভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সুযোগে একটি দালালচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আমরা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কাজ করছি। হাসপাতালের সার্বিক সমস্যার বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’

রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা শুধু রংপুরের নয়, এটি সারাদেশের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। তিনি হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত ও জনবল সংকট সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের পর ধাপে ধাপে এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘রংপুর মেডিকেলে যন্ত্রপাতি সচল করা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং দালালচক্র নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জনগণ যেন দ্রুত সুফল পায়, সে জন্য আমরা সংসদে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছি।’

রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বলেন, ‘রংপুর বিভাগের মানুষের চিকিৎসাসেবার বর্তমান চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে রংপুরে এসে নিজ চোখে পরিস্থিতি দেখার আহ্বান জানাচ্ছি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতি অচল পড়ে থাকায় এক দিকে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘রোগীদের দুর্ভোগ লাঘব এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।’

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

পরিদর্শনকালে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে অচল যন্ত্রপাতি সরিয়ে নতুন মেশিন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের উদ্যোগও বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে সম্প্রতি এক ইন্টার্ন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে লাশ আটকে রেখে মৃত ব্যক্তির ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগের ঘটনাও পরিদর্শনকালে আলোচনায় আসে। এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে সংসদ সদস্যরা বলেন, চিকিৎসাসেবার সঙ্গে মানবিক আচরণ ও পেশাগত নৈতিকতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সতর্কবার্তা

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে সেবা নিতে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও সচল যন্ত্রপাতির অভাবে হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে দ্রুত সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।