‘মে দিবস’ প্রায় দেড়শত বছর যাবৎ পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের চেতনা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী, বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষসহ মুক্তিকামী মানুষ ও তাদের সংগঠনগুলো মে দিবসে আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশ করার মাধ্যমে মুক্তি সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় এবং ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রকাশ ঘটায়। কোটি কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগান।
বাংলাদেশে মে দিবসের গুরুত্ব
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে মে দিবস পালন করে। একাত্তরে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশও রাষ্ট্রীয়ভাবে মে দিবস পালন করে আসছে। এবারের মে দিবস পালন ভিন্নমাত্রার গুরুত্ব বহন করে। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম এবং চব্বিশের শ্রমিক-ছাত্র-জনতার সম্মিলিত জাগরণ ও রক্তদানের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং জনগণের বহু কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি প্রথম মে দিবস। স্বাভাবিকভাবেই এই দিবসকে কেন্দ্র করে এবার শ্রমজীবী মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দীপনা অনেক বেশি।
শ্রমজীবীদের প্রত্যাশা
স্বাভাবিকভাবেই এবারের মে দিবসে দেশের শ্রমজীবী মানুষ বিএনপি সরকারের কাছে শ্রম ইস্যুতে আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা, অগ্রাধিকার এবং আশু ও ধাপে ধাপে করণীয় সম্পর্কে সরকারের কাছ থেকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রত্যাশা করে। এক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার হতে পারে প্রধান ভিত্তি। এই ইশতেহারের পক্ষে জনগণের রায় উক্ত ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকারের ম্যান্ডেট ও দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে।
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন
শ্রম ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করার একটি সামগ্রিক সর্বজনীন দলিল হচ্ছে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’-এর প্রতিবেদন—‘শ্রম জগতের রূপান্তরের রেখা’। গত মে দিবসের (২০২৫) এক সপ্তাহ আগে কমিশনের প্রতিবেদন তৎকালীন সরকার প্রধানের কাছে প্রদান করা হয়েছিল। শ্রম জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব অংশীদারদের সঙ্গে বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিক ও মালিক প্রতিনিধি, মন্ত্রণালয়, প্রশাসন অধিদফতর, শ্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর বিভাগের সঙ্গে বৈঠক, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, আইনজীবীদের মতবিনিময় ও পরামর্শের আলোকে এই প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে।
দেশের প্রায় আট কোটি শ্রমিক ও তাদের পরিবারের অধিকার সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়ন, উন্নত শিল্প সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন এবং সর্বোপরি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মর্যাদাকর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে একটি সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন এটি—যা কমিশনের মালিক-শ্রমিক সদস্যসহ কমিশনের সব সদস্য সর্বসম্মতিক্রমে সই করেছেন। এই প্রতিবেদন এখন একটি জাতীয় দলিল।
বাস্তবায়নের পথনির্দেশনা
এই প্রতিবেদনের আলোকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি পরিশ্রম করে বাস্তবায়নের অগ্রাধিকারসম্পন্ন কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে, যা হতে পারে সরকারের আগামী দিনের কাজ করার একটি পথনির্দেশনা। এই প্রতিবেদনে যুগ যুগ ধরে এ দেশে শ্রমের মর্যাদা, শ্রমিকের অধিকার ও শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা প্রদান এবং নিরাপদ কাজের পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতি যে উপেক্ষার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেখান থেকে একটি মৌলিক রূপান্তরের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয় রূপান্তর
বর্তমান বৈষম্যমূলক ও ভারসাম্যহীন অবস্থা শুধু কোটি কোটি শ্রমিককে বঞ্চিতই রাখছে না—দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, অর্থবহ কর্মসংস্থানসহ উৎপাদন ও উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সর্বোপরি প্রযুক্তির উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারসহ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের শ্রম জগতের রূপান্তর অপরিহার্য।
শ্রমিক ইশতেহার ও রাজনৈতিক দলের সমর্থন
শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের প্রধান প্রধান জাতীয় শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করে—এমন সংগঠনের জাতীয় মোর্চা ‘শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম’ নিয়ে গঠিত ‘শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স’-এর মাধ্যমে প্রস্তুত করা ‘শ্রমিক ইশতেহার’ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব রাজনৈতিক দলের কাছে পেশ করা হয়েছিল। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি অ্যালায়েন্সের কনফারেন্সে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রধান প্রধান নেতৃত্ব এই ইশতেহারকে সমর্থন দিয়েছিলেন। আশার কথা যে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন এবং শ্রমিক ইশতেহারের ব্যাপক প্রতিফলন ঘটেছে।
আমাদের প্রত্যাশা ও বিশ্বাস—বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘শ্রম ও শ্রমিক কল্যাণ’, কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ ও দারিদ্র্য বিমোচনসহ যেসব অঙ্গীকার জাতির কাছে প্রদান করেছে এবং ম্যান্ডেট লাভ করেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন শ্রম জগতের রূপান্তরে দেশকে একটি অর্থবহ অভিযাত্রা শুরু করতে পারবে।
শ্রম জগতের বর্তমান অবস্থা
ওপরে উল্লিখিত সব দলিলে আজকের বাংলাদেশের শ্রম জগতের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কোনোভাবেই উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়া এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার সহায়ক নয়, বরং দেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করছে। দেশে কোনও জাতীয় শ্রমমান নেই। দেশের পঞ্চাশ ভাগ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ও স্বনিয়োজিত এবং সব আইনগত সুরক্ষা ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির আওতার বাইরে। প্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে আউটসোর্সিং ও অস্থায়ী নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল শ্রমিককে সকল সুরক্ষার বাইরে রাখা হচ্ছে।
দুর্ঘটনা ও কাজ এখানে হাত ধরাধরি করে চলে। বকেয়া মজুরির দাবিতে শ্রমিককে রাস্তায় অবরোধ করতে হয়। যে শহরের রাস্তায় পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি চলে, সেখানে ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ রিকশা চালান। লাখ লাখ যুবা শ্রমশক্তি দেশে, দেশের বাইরে যেকোনও ধরনের কাজ করতে বাধ্য হয়। দেশে ও দেশের বাইরে বাংলাদেশ পরিচিত হয়ে উঠছে সস্তা শ্রমের দেশ হিসেবে।
পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা
আমাদের এই অবস্থার পরিবর্তন করতেই হবে এবং আমরা সেটা পারবো। কিন্তু সেটা করতে হলে প্রথমেই আমাদের উন্নয়নের গতানুগতিক যে ধারণার ভিত্তিতে শ্রম ক্ষেত্রের জন্য নীতি প্রণীত হয়, সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জসমূহ বিবেচনায় রেখে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার রূপরেখা তৈরি করতে হবে। ‘যেকোনও কাজ, কাজ না থাকার চেয়ে ভালো’, ‘সস্তা শ্রমই আমাদের প্রতিযোগিতার শক্তি’, বিনিয়োগ আর ডলার রেমিট্যান্সই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য—এসব অচল বক্তব্য থেকে সরে এসে উৎপাদনশীল সব শক্তির বিকাশ, উপযুক্ত কাজের সুযোগ ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং শ্রমিকের সংগঠিত হওয়া, দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে কার্যকর সামাজিক সংলাপ ও উন্নত শিল্প সম্পর্কের চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের মুখবন্ধের ‘নির্বাচনি অঙ্গীকার: প্রধান প্রতিশ্রুতি’ অংশ থেকে দুটি লাইন উদ্ধৃত করে লেখাটি শেষ করতে চাই— “এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা—এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।”
আমরা বিশ্বাস করি—লুটপাটের বিপরীতে উৎপাদনশীল অর্থনীতি এবং সে লক্ষ্যে উৎপাদনের প্রধান শক্তি আট কোটি শ্রমজীবী মানুষের দক্ষতা ও যথাযথ কাজ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা, সবসময় কাজ হারানোর ভয় এবং বার্ধক্যে, অসুস্থতায় বা কোনও কারণে কর্মঅক্ষম হয়ে পড়লে পরিবারের অভুক্ত থাকার ভয়ের বিপরীতে কাজের ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং সহায়তা পাওয়ার অধিকার, বৈষম্যমূলক মজুরির বিপরীতে জীবন বিকাশ উপযোগী মজুরির নিশ্চয়তা এবং ন্যায্য হিস্যার অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমরা লুটপাটের অর্থনীতির বিপরীতে উৎপাদনশীল, বৈষম্যহীন ও অধিকারভিত্তিক একটি শ্রম জগৎ গড়ে তুলতে পারি—যা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপাদান হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
লুটপাটের অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্য
আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে—বাংলাদেশে শুধু ব্যাংক লুট আর ঠিকাদারির মাধ্যমেই লুটপাটের অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়নি। দশকের পর দশক ধরে শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রতি অবজ্ঞা, সস্তা মজুরি, লাগামহীন শ্রমশোষণের সুযোগ করে দেওয়া, উৎপাদন উন্নয়নের সুফল থেকে সিংহভাগ মানুষকে বঞ্চিত করার যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেটিও লুটপাটের অর্থনীতি ও বৈষম্য সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে নির্বাচনের প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার প্রধানের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাই এবারের মে দিবসে শ্রমজীবী মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস



