চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কর্মক্ষেত্রে ১৮৬ শ্রমিক নিহত
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কর্মক্ষেত্রে ১৮৬ শ্রমিক নিহত

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৮৫ জনই পুরুষ। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে পরিবহন খাতে। আর বেশি আহত হয়েছেন পোশাকশ্রমিকেরা। আজ ২৮ এপ্রিল জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সেমিনারের আয়োজন ও উদ্দেশ্য

‘নিরাপদ কর্মপরিবেশ: সবাই মিলে সবার জন্য’ শীর্ষক সেমিনারটি আয়োজন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।

মৃত্যুর খাতভিত্তিক পরিসংখ্যান

বিলসের সংবাদপত্রভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে নিহত ১৮৬ শ্রমিকের মধ্যে ১৮৫ জন পুরুষ ও ১ জন নারী। খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে পরিবহন খাতে। কৃষিতে ১৯, নির্মাণে ১৪, প্রবাসী শ্রমিক ১১, দিনমজুর ১১, মৎস্য খাতে ৯, বিদ্যুৎ খাতে ৬ এবং অন্যান্য খাতে ৯ জন নিহত হন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আহত শ্রমিকের সংখ্যা

একই সময়ে আহত হয়েছেন ৩৩৫ শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে ৩১৯ জন পুরুষ ও ১৬ জন নারী। পোশাক খাতে সর্বোচ্চ ২৫০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ওয়ার্কশপ, পরিবহন, মৎস্য, পাদুকাশিল্প, স্টিলমিল, নির্মাণ ও হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

২০২৫ সালের তুলনামূলক চিত্র

২০২৫ সালের কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৭৩৫ শ্রমিক নিহত হন। এর মধ্যে ৪৩৯ জনই পরিবহন খাতের। কৃষিতে ৭৩, নির্মাণে ৬৭, মৎস্যে ৩৫, দিনমজুর ৩২ এবং বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিক প্রাণ হারান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বক্তাদের মতামত

সেমিনারে বক্তারা বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর তৈরি পোশাক খাতে ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে অনানুষ্ঠানিক খাতের অধিকাংশ শ্রমিক এখনো সুরক্ষার বাইরে। কার্যকর সুরক্ষা কমিটির অভাব, সীমিত পরিদর্শন ব্যবস্থা, নারীশ্রমিকদের নিরাপত্তাঘাটতি এবং মনঃসামাজিক ঝুঁকি—এসব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

আলোচিত বিষয়বস্তু

আলোচনায় শিল্পকারখানায় সেফটি গভর্ন্যান্স, কেমিক্যাল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, টেকসই নগরায়ণ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১৫৫ ও ১৮৭ বাস্তবায়নের অগ্রগতি উঠে আসে। বক্তারা বলেন, শুধু নিয়ম মানার ওপর নির্ভর না করে নিরাপত্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে হবে। তাঁরা আরও বলেন, কার্যকর শ্রম আইন প্রয়োগ, পরিদর্শন জোরদার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাস্তবধর্মী উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। এ জন্য প্রমাণভিত্তিক গবেষণা ও অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

যৌথ কৌশল প্রণয়ন

সেমিনারে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা জোরদারে একটি ‘যৌথ কৌশল’ প্রণয়নে অংশগ্রহণকারীরা ঐকমত্যে পৌঁছান। তাঁদের মতে, তথ্য ও গবেষণালব্ধ ফলাফল কার্যকরভাবে প্রচার করা গেলে শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।

সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা

বিলসের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভুঁঞার সভাপতিত্বে সেমিনার সঞ্চালনা করেন নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। সেমিনারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, ট্রেড ইউনিয়ন, শিল্প ও মালিকপক্ষ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, মানবাধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

দিবসের গুরুত্ব

উল্লেখ্য, প্রতিবছর ২৮ এপ্রিল জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস পালন করা হয়। দিবসটির লক্ষ্য কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও পেশাগত রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি। এদিন বিশ্বব্যাপী নিহত শ্রমিকদের স্মরণেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘মনঃসামাজিকভাবে স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ’।