কিডনি ক্যানসার: ৭টি ভুল ধারণা ও বাস্তব তথ্য জানুন
কিডনি ক্যানসার: ৭টি ভুল ধারণা ও বাস্তব তথ্য

কিডনি ক্যানসার কী? ৭টি প্রচলিত ভুল ধারণা ও আসল তথ্য

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি দেখা দেওয়া ১০টি ক্যানসারের একটি হওয়া সত্ত্বেও কিডনি ক্যানসার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা রকম ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন সব কিডনি ক্যানসারই এক, এটি সবসময় বংশগত কারণে হয় কিংবা এই রোগ হওয়া মানেই পুরো কিডনিটাই ফেলে দিতে হবে।

চিকিৎসকদের মতে, বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত দুই দশকে এই রোগের চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ভারতের ফোর্টিস হাসপাতালের ইউরো অ্যান্ড ইউরো অনকোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ড. অমিত বনসাল বলেন, ‘কিডনি ক্যানসারকে একটি একক রোগ হিসেবে না দেখে এর জটিলতা ও ধরনগুলো বোঝা জরুরি। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব।’

নিচে কিডনি ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ৭টি বড় ভুল ধারণা এবং এর পেছনের আসল তথ্য তুলে ধরা হলো:

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভুল ধারণা-১: সব কিডনি ক্যানসারই একই রকম

আসল তথ্য: কিডনি ক্যানসার মূলত কোনো একক রোগ নয়, এর বিভিন্ন উপাদানের ওপর ভিত্তি করে একে কয়েকটি উপভাগে ভাগ করা হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ শতাংশ কিডনি ক্যানসারই হলো রেনাল সেল কার্সিনোমা। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ক্লিয়ার সেল রেনাল সেল কার্সিনোমা (প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে)। ক্যানসারের ধরন অনুযায়ী এর আচরণ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্ন হয়ে থাকে।

ভুল ধারণা-২: কিডনি ক্যানসার সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রভাব ফেলে

আসল তথ্য: কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। সাধারণত ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সিদের মধ্যে এবং নারীদের তুলনায় পুরুষদের এই ক্যানসার বেশি শনাক্ত হয়। প্রধান ঝুঁকিসমূহ: ধূমপান, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ, দীর্ঘদিন ধরে ডায়ালিসিস চলা এবং কিছু নির্দিষ্ট বংশগত জিনগত ত্রুটি এই ক্যানসারের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভুল ধারণা-৩: কিডনি ক্যানসার মানেই তা বংশগত

আসল তথ্য: বেশিরভাগ কিডনি ক্যানসারই বংশগত কারণে হয় না। চিকিৎসকদের মতে, সামগ্রিকভাবে মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ক্যানসার বংশগত বা জিনগত কারণে হয়ে থাকে। কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই হার আরও কম। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে জীবনের কোনো এক পর্যায়ে ডিএনএ-র আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে এই রোগ বাসা বাঁধে।

ভুল ধারণা-৪: কিডনি ক্যানসারের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং টেস্ট রয়েছে

আসল তথ্য: স্তন ক্যানসার (ম্যামোগ্রাফি) বা প্রোস্টেট ক্যানসারের মতো সাধারণ ও সুস্থ মানুষের জন্য কিডনি ক্যানসারের কোনো নিয়মিত স্ক্রিনিং টেস্ট বা পরীক্ষা নেই। চিকিৎসকরা সাধারণত তখনই স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেন যখন কারো পরিবারে নির্দিষ্ট কিছু বংশগত সিন্ড্রোম থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্য কোনো রোগের জন্য আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যান করার সময় হঠাৎ করেই কিডনির টিউমার ধরা পড়ে।

ভুল ধারণা-৫: এই ক্যানসার হলে পুরো কিডনিই কেটে ফেলে দিতে হয়

আসল তথ্য: বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক আধুনিক ও সুনির্দিষ্ট। আগে পুরো কিডনি ফেলে দেওয়া (র‌্যাডিক্যাল নেফ্রেক্টমি) নিয়মিত ঘটনা হলেও, এখন চিকিৎসকরা টিউমারের আকার ও অবস্থান দেখে শুধু আক্রান্ত অংশটুকুই অস্ত্রোপচার করে বাদ দেন, যাকে পার্শিয়াল নেফ্রেক্টমি বলা হয়। এর ফলে বাকি কিডনি সুরক্ষিত থাকে। এছাড়াও থার্মাল অ্যাবলেশন, ইমিউনোথেরাপি এবং টার্গেটেড থেরাপির মতো আধুনিক নানা চিকিৎসা এখন সহজলভ্য।

ভুল ধারণা-৬: কিডনি ক্যানসার এবং সাধারণ কিডনি রোগ একই বিষয়

আসল তথ্য: এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যা। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনির ফিল্টারিং বা ছাঁকন ক্ষমতা কমে যাওয়াকে বলা হয় কিডনি রোগ। অন্যদিকে, কিডনির ভেতর অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির ফলে টিউমার তৈরি হওয়াকে বলে কিডনি ক্যানসার। তবে হ্যাঁ, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ থাকলে কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।

ভুল ধারণা-৭: কিডনি ক্যানসার ছোঁয়াচে

আসল তথ্য: কিডনি ক্যানসার কোনো সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির স্পর্শ, তার সঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়া বা কাছাকাছি থাকার মাধ্যমে এই রোগ কখনোই অন্য কারো শরীরে ছড়াতে পারে না। এটি মূলত শরীরের ভেতরের ডিএনএ-র পরিবর্তনের ফলে ঘটে থাকে।

সবশেষে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির কল্যাণে কিডনি ক্যানসারের রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের হার আগের চেয়ে অনেক উন্নত। এই রোগ প্রতিরোধে লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা এবং সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে জরুরি।