বাংলাদেশের ৩১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই, শীর্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্বেগ
৩১ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই, উদ্বেগ নিয়ন্ত্রকের

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব সংকট: ৩১ প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য নেই

বাংলাদেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতে ক্রমবর্ধমান নেতৃত্বের শূন্যতা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে নিয়োগকৃত উপাচার্য ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এই অবস্থা প্রশাসনিক মান, নিয়ন্ত্রক আনুগত্য এবং শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

ইউজিসির কঠোর হুঁশিয়ারি ও সম্ভাব্য ব্যবস্থা

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী শিক্ষাগত নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে ইউজিসি সতর্কবার্তা জারি করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাধ্যতামূলক শর্তাবলী পূরণে ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে সরকারি সহায়তা হ্রাসসহ কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হতে পারে। ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, "আমরা ইউজিসি প্রোটোকল অনুযায়ী সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি সহায়তা ও সহযোগিতা হারাতে পারে।"

অনুমোদন সত্ত্বেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে

ইউজিসির সর্বশেষ হালনাগাদকৃত তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ১১২টি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার উপযুক্ত অবস্থায় রয়েছে, অন্যদিকে চারটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • আইবিএআইএস বিশ্ববিদ্যালয়
  • দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা
  • আমেরিকা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়
  • কুইন্স ইউনিভার্সিটি

এছাড়াও পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাওয়ার বছরগুলো পরেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় প্রায় এক দশক আগে অনুমোদনপ্রাপ্ত রূপায়ণ এ কে এম শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেনি। একইভাবে ঢাকার উত্তরা ২০২০ সালে অনুমোদনপ্রাপ্ত মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এখনও তার কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।

উপাচার্যবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকা

ইউজিসির রেকর্ড অনুযায়ী, বর্তমানে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  1. ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক
  2. পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
  3. এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
  4. বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
  5. সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
  6. ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
  7. ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
  8. রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা
  9. অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
  10. বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি

তালিকায় আরও রয়েছে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়, যার মধ্যে বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (সৈয়দপুর), বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (কাদিরাবাদ), বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (কুমিল্লা), নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (খুলনা), রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া), সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনা খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, ড. মমতাজ বেগম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়, জাস্টিস আবু জাফর সিদ্দিকী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়।

নিয়োগ প্রক্রিয়া ও বাস্তবতার ব্যবধান

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনটি প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা—উপাচার্য, প্রো-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে হয়। ট্রাস্টি বোর্ডদের এই পদগুলোর জন্য প্রার্থী প্রস্তাব করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নাম জমা দিতে হয়। ইউজিসি যাচাই-বাছাইয়ের পর চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত নিয়োগ দেন।

তবে খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করে যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে আনুষ্ঠানিক নিয়োগ সম্পূর্ণ না করেই। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী উপাচার্যের অনুপস্থিতি শিক্ষাগত পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক দক্ষতায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।

ছাত্রদের ওপর প্রভাব ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

একজন প্রাক্তন উপাচার্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "উপাচার্য হচ্ছেন প্রধান শিক্ষাগত কর্তৃপক্ষ। স্থিতিশীল নেতৃত্ব ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, শিক্ষার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে যায়।"

শিক্ষা বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে দীর্ঘায়িত প্রশাসনিক শূন্যতা শেষ পর্যন্ত ছাত্রদেরকেই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। তাদের মতে, নেতৃত্বের শূন্যতার ফলে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে:

  • শিক্ষাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব
  • পরীক্ষা ও ফলাফল প্রকাশে জটিলতা
  • গবেষণা ও শিক্ষাগত উন্নয়নে বিঘ্ন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। ১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয় এবং গত তিন দশকে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সময়োচিত নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের আহ্বান

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মান বজায় রাখতে নিয়মকানুনের কঠোর প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তারা প্রধান কর্মকর্তাদের নিয়োগের জন্য বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুমোদন পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং ছাত্রদের স্বার্থ রক্ষায় সময়োচিত নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। ইউজিসি আশা প্রকাশ করেছে যে এই ব্যবস্থাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।