জ্বালানি সংকটে অনলাইন ক্লাসের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের দৃঢ় অবস্থান
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উপায় নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এই সেমিনারের আয়োজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
অংশীজনদের মতামত: অনলাইন ক্লাসের বিরুদ্ধে জোরালো আপত্তি
সেমিনারে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা অংশ নিয়ে স্পষ্টভাবে অনলাইন ক্লাসের বিপক্ষে মতামত দেন। তাঁরা উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হলে পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হবে। করোনাকালে অনলাইন ক্লাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তারা বলেন, এই পদ্ধতি তেমন কার্যকর হয়নি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নিশাত তিথি বলেন, "অনলাইন ক্লাস বিভিন্ন রকমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং পড়াশোনায় ঘাটতি পড়বে বলে আমি মনে করি।" মাদ্রাসাছাত্র কামাল হোসেনও অনলাইন ক্লাসের চিন্তাকে শিক্ষার্থীদের জন্য সমস্যাজনক বলে অভিহিত করেন।
বিকল্প প্রস্তাব: সশরীর ক্লাস ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরামর্শ
অভিভাবক ও শিক্ষকরা সশরীর ক্লাসের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব দেন। হজরত শাহ আলী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর অভিভাবক শাহিদা বেগম বলেন, "আমরা চাচ্ছি অনলাইন ক্লাস না করে পাঁচ ঘণ্টার ক্লাস তিন ঘণ্টায় সংক্ষিপ্ত করা হোক, যাতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।"
পুরান ঢাকার এক শিক্ষক বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দিনের আলোয় শ্রেণি কার্যক্রম চালানো, সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করা এবং শীতাতপ যন্ত্র বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আব্দুস সালাম শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটিকে কাজে লাগিয়ে সপ্তাহের অন্য দিন ছুটি দেওয়ার সুপারিশ করেন।
মন্ত্রীদের প্রতিক্রিয়া: হাইব্রিড পদ্ধতি পরীক্ষার পরিকল্পনা
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের উপস্থিতিতে সেমিনারে অংশীজনদের মতামত শোনা হয়। শিক্ষামন্ত্রী জানান, সারা দেশ বা মহানগরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে হাইব্রিড বা ব্লেন্ডেড পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, "নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন শিক্ষাধারা আমরা আস্তে আস্তে প্রবর্তন করতে চাই।" উপস্থিত শিক্ষার্থীদের 'ইয়েস অর নো' জবাব দিতে বললে তারা 'ইয়েস' বলে চিৎকার করেন। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ অংশীজনদের সমাধান প্রস্তাব দিতে উৎসাহিত করে বলেন, "আপনাদের সমাধান থেকে বাছাই করে সবচেয়ে ভালো পথে যাওয়ার কাজ আমরা করব।"
পটভূমি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
গত ২৯ মার্চ প্রায় ৪০ দিনের ছুটির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে পড়েছে অনেক দেশ, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
সেমিনারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান প্রমুখ।



