বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই এখন নারীর জয়যাত্রা দৃশ্যমান। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার দোরগোড়ায় নারী–পুরুষ এখন প্রায় সমান। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে ছাত্রী ভর্তির হার ছিল ৩৮ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৪১ শতাংশে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই সফলতার প্রতিফলন মিলছে না দেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) ৪৪তম থেকে ৪৯তম বিসিএসের লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও ক্যাডার হিসেবে চূড়ান্ত সুপারিশের ক্ষেত্রে তাঁরা পুরুষদের তুলনায় এখনও যোজন যোজন পিছিয়ে।
উচ্চশিক্ষা বনাম বিসিএস সাফল্য
পরিসংখ্যান বলছে, ৪৪তম ও ৪৫তম সাধারণ বিসিএসে আবেদনকারীদের মধ্যে গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। ৪৪তম বিসিএসে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮০ নারী আবেদন করলেও চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ৩৩৮ জন, যা মোট সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের মাত্র ২০ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ নারী হওয়া সত্ত্বেও প্রতি পাঁচজন ক্যাডারের মধ্যে চারজনই পুরুষ।
একই চিত্র ৪৫তম বিসিএসেও, সেখানে নারী আবেদনকারী ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯২০ হলেও সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ২১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। সবচেয়ে বড় ব্যবধান চোখে পড়ে ৪৯তম বিসিএসে। এই পরীক্ষায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫২১ নারী আবেদন করলেও চূড়ান্ত সাফল্য পেয়েছেন মাত্র ১১২ জন, যা মোট সুপারিশের ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অথচ উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ এখন ৫০ শতাংশের বেশি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলের ধারা বিসিএসের চূড়ান্ত ধাপে এসে হোঁচট খাচ্ছে।
লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান
৪৪তম বিসিএস
- পুরুষ: আবেদন ২,১২,০২৪, সুপারিশ ১,৩৩৮ (৭৯.৮৩%)
- নারী: আবেদন ১,৩৮,৬৮০, সুপারিশ ৩৩৮ (২০.১৭%)
- তৃতীয় লিঙ্গ: আবেদন ১২, সুপারিশ ০
- মোট: আবেদন ৩,৫০,৭১৭, সুপারিশ ১,৬৭৬
৪৫তম বিসিএস
- পুরুষ: আবেদন ২,০৮,৯৭৯, সুপারিশ ১,৪২৭ (৭৮.৯৭%)
- নারী: আবেদন ১,৩৭,৯২০, সুপারিশ ৩৮০ (২১.০৩%)
- তৃতীয় লিঙ্গ: আবেদন ২৩, সুপারিশ ০
- মোট: আবেদন ৩,৪৬,৯২৩, সুপারিশ ১,৮০৭
৪৮তম বিসিএস (বিশেষ–স্বাস্থ্য)
- পুরুষ: আবেদন ১৮,২১৮, সুপারিশ ২,০৫৯ (৫৮.৮৩%)
- নারী: আবেদন ২২,৮০৫, সুপারিশ ১,৪৪১ (৪১.১৭%)
- মোট: আবেদন ৪১,২০৩, সুপারিশ ৩,৫০০
৪৯তম বিসিএস (বিশেষ–স্বাস্থ্য)
- পুরুষ: আবেদন ১,৭৬,২০১, সুপারিশ ৫৫৬ (৮৩.২৩%)
- নারী: আবেদন ১,৩৬,৫২১, সুপারিশ ১১২ (১৬.৭৭%)
- তৃতীয় লিঙ্গ: আবেদন ৩০, সুপারিশ ০
- মোট: আবেদন ৩,১২,৭৫২, সুপারিশ ৬৬৮
কেন এই ব্যবধান?
পরিসংখ্যান অনুযায়ী উচ্চশিক্ষায় নারী–পুরুষের ব্যবধান ঘুচে গেলেও বিসিএস পরীক্ষায় এই পিছিয়ে থাকার পেছনে কাজ করছে গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। দেশের প্রায় সব পাবলিক পরীক্ষায় মেয়েরা সিজিপিএ ও পাসের হারে এগিয়ে থাকলেও ক্যারিয়ার গঠনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে তারা বহুমুখী বাধার সম্মুখীন হয়। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গবেষণা অনুযায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রে নারীদের তথ্যপ্রযুক্তি ও গবেষণায় অংশগ্রহণে পিছিয়ে রাখে।
কারিগরি শিক্ষায় ছাত্রীদের হার মাত্র ২৯ শতাংশ এবং প্রকৌশল বিদ্যায় মাত্র ২১ শতাংশের ঘরে থাকা বিসিএসের টেকনিক্যাল ক্যাডারে তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরপরই অনেক মেধাবী নারী পারিবারিক ও সামাজিক চাপে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন, যা তাঁদের বিসিএসের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটায়। বিসিএসের বিশাল সিলেবাস আয়ত্ত করার জন্য যে নিরবচ্ছিন্ন সময় ও পরিবেশ প্রয়োজন, সেটি বিবাহিত বা সাংসারিক দায়িত্বে থাকা নারীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।’
সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা আরও উল্লেখ করেন যে, ‘সমাজে রক্ষণশীলতা দিন দিন বাড়ছে, যার ফলে নারীর ক্ষমতায়নের ধারণাকে এখনো নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এ ছাড়া নারীর দক্ষতা নিয়ে পুরোনো মনস্তাত্ত্বিক ধারণার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। প্রশাসক হিসেবে একজন নারী সফল হবেন, এ ধারণাটি পরিবার ও সমাজ, এমনকি আমাদের নীতিনির্ধারক বা কর্তাব্যক্তিদের কাছে আজও প্রশ্নবিদ্ধ। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত অনেক নারী বিসিএস প্রস্তুতি নেওয়ার চেয়ে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক কিংবা অন্য কোনো কম প্রতিযোগিতামূলক ও তথাকথিত “নিরাপদ” পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।’
নারীশিক্ষার অগ্রযাত্রা
অথচ দেশের নারীশিক্ষার গ্রাফ বর্তমানে ঈর্ষণীয়। প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর ৬১ দশমিক ৩৫ শতাংশ ও উচ্চমাধ্যমিকে প্রায় ৫১ দশমিক ৮৩ শতাংশই নারী। চিকিৎসা শিক্ষার মতো উচ্চতর পেশাগত শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের হার ৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে। যার সরাসরি প্রভাব দেখা গেছে ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে, যেখানে পুরুষ ও নারী প্রার্থীর সুপারিশের হারের ব্যবধান অন্যান্য বিসিএসের তুলনায় অনেক কম (৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ নারী)। এটি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিবেশ ও সুযোগ পেলে নারীরাও বিসিএসের মতো কঠিন পরীক্ষায় নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চশিক্ষার এই ৫০ শতাংশ নারীর সফলতাকে বিসিএস বা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে আসতে হলে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নের পূর্ণ সুফল পেতে হলে শুধু ডিগ্রি অর্জনই যথেষ্ট নয়; বরং পেশাজীবনে সমানতালে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো উপযুক্ত পরিবেশ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা প্রয়োজন।



